ফোটো রিপোর্ট (বর্ণনা) – অসীমের একটি বিভাগ – মস্কোয় অনুষ্ঠিত "ফোটো বিয়েনালে" (প্রতি দুই বছরে অনুষ্ঠিত হয় বলে, এই রকম নাম) – ২০১০ নামের ফোটো প্রদর্শনীর একটি বিশাল জায়গা নিয়ে এই বিভাগের ছবি রাখা হয়েছে.

"কিছুই প্রমাণ করার দরকার নেই, কিছুই বিশেষ করে দেখানোর দরকার নেই – শুধু বাস্তবের একটি অংশকে ধরতে পারা. জিনিস ও মানুষ নিজেরাই নিজেদের কথা বলে থাকে. শিল্প সৃষ্টির একটি বিরল তম মূহুর্ত হল সেকেন্ডের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ সময়, যখন ক্যামেরার লেন্সের ঢাকনা ওঠে, ক্যামেরার ভিতরে আলো ঢোকে আর সমস্ত গতি স্তব্ধ হয়ে যায়". বিখ্যাত ফরাসী ফোটো চিত্র শিল্পী আঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসঁ (১৯০৮ – ২০০৪) এই ভাবেই বর্ণনা করেছিলেন ঘটনার বর্ণনা মূলক ফোটোগ্রাফী সম্বন্ধে বলতে গিয়ে. তাঁর ছবির প্রদর্শনী "ফোটো বিয়েনালে" তে কেন্দ্রীয় অংশে দেখানো হচ্ছে.

"আমার জন্য ফোটো তোলার ক্যামেরা একটা ডায়েরী, অন্তর্দৃষ্টি ও তাত্ক্ষণিকতার যন্ত্র, যাতে মূহুর্ত ধরে রাখা যায়, নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে আর তার উত্তর দিতে গিয়ে আঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসঁ যোগ করেছেন, — ফটোগ্রাফারের চুড়ান্ত লক্ষ্য হল ক্রমাগত হারিয়ে যাওয়া জিনিস কে ধরে রাখা. আর যখন সে গুলি হারিয়ে যায়, এই জগতের কোন কিছুই তাদের ফিরতে বাধ্য করতে পারে না". তিনি সত্তর বছর ধরে ফোটো ক্যামেরা নিয়ে ঘুরেছেন, পৃথিবীর কোন মহাদেশেই তিনি ছবি তুলতে বাকি রাখেন নি. তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে – অন্য দেশ, সামরিক বিরোধ, আনুষ্ঠানিক উত্সব এবং প্রতিবাদ সমাবেশ কিন্তু ফটোগ্রাফার এই সব ঘটনাকে বিশেষ করে ধরে না রেখে বরং তার চারপাশের বিষয়কেই বেশী করে তুলে ধরেছেন. তাই তাঁর কুয়োমিনটাং সরকারের শাসনের শেষ কদিন সিরিজের ছবিতে কোন রাজনৈতিক নেতার ছবি নেই, বরং আছে চীনের লোকেদের সমষ্টি গত ভাবে বিদ্রোহ করতে যাওয়ার ছবি এবং গণ আতঙ্কের ছবি. গান্ধীজীর শেষ কৃত্য অনুষ্ঠানের ছবি তুলতে গিয়ে তিনি শুধুমাত্র আসল অনুষ্ঠানের ছবি তুলেই থেমে থাকেন নি, বরং বেশী করে তুলেছেন উপস্থিত শোক বিহ্বল মানুষদের ছবি, যাঁরা ভাল করে দেখতে পাওয়ার জন্য উঁচু গাছ দের গায়ে একেবারে লেপটে গিয়েছেন. আঁরি কার্তিয়ে- ব্রেসঁ সময় ও জায়গা বুঝতে পারতেন খুব সংবেদনশীল ভাবে. তাই ১৯৫০ এর দশকে মস্কোতে এসে তিনি বাড়ী ঘর তৈরী করার শ্রমিকদের খাওয়ার হোটেলের ছবি তুলতে গিয়ে যেন অন্য মনস্ক ভাবেই ছবির ফ্রেমে বন্দী করেছেন লেনিন ও স্তালিনের ছবি. দ্বিতীয় বার ফটোগ্রাফার সোভিয়েত দেশে এসেছিলেন ১৯৭০ এর দশকে এবং মস্কোর ফটোগ্রাফির যাদুঘরের ডিরেক্টর ওলগা স্ভিবলভার কথা মতো কার্তিয়ে-ব্রেসঁ সোভিয়েত দেশ সম্বন্ধে খুব একটা ভাল অভিজ্ঞতা নিয়ে যান নি. তা না হলে কেন তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিন অবধি এই দেশকে মনে করতে গিয়ে কথা বলতে হলে প্রায় ফিসফিস করে বলতেন. যখন এই দেশের পুরনো প্রশাসন অনেক দিন আর ছিল না, তখনও তাঁর সেই জমা আতঙ্ক ছিল. তার ওপর আজ আর কেউ জানে না যে, সেই সময়ে মস্কোতে তোলা কত ফোটো কখনও লোকে দেখতে পায় নি. প্রসঙ্গতঃ এই গুণী মানুষ টির তোলা গোপন ফোটো প্রতিটি যাত্রার পরেই থেকে যেত, ওলগা স্ভিবলভার মতেঃ

"আঁরি কার্তিয়ে- ব্রেসঁ প্রায় দশ লক্ষ ফোটোর নেগেটিভ নিজের কাছে রেখে ছিলেন, এই সব ছবির বেশীর ভাগই তিনি ৭০ বছর ধরেই বন্ধ করে রেখেছিলেন, যাতে ইতিহাস নিজেই বিচার করে, কি বিষয়ের সত্যিকারের মানে আছে এবং আমরা তাঁর শিল্পকে কিভাবে গ্রহণ করব".

ফোটো বিয়েনালে তে আলাদা করে সোভিয়েত ফটোগ্রাফির ক্ল্যাসিক আর্কাদি শাইখেত (১৮৯৮ – ১৯৫৯) এর ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে. তাঁর জীবনেও খুব কম কষ্ট হয় নি, রিপোর্টার  - এক আশঙ্কা জনক পেশা, আর সেই সব একনায়ক তন্ত্রের দিনে – বলা যেতে পারে একেবারে বিপজ্জনক পেশা, কোন রাজনৈতিক নেতার ছবি একটু বাজে হলে, এমনকি যদি তা কোথাও প্রকাশ না করে হয়েও থাকে, তাহলেও বিপদ. শাইখেত ও চার মাস বন্দী হয়েছিলেন, দোষ ছিল জার্মান প্রলেতারিয়েত নেতা ক্লারা স্বেতকিন এর ছবি তুলে দেখতে পেয়েছিলেন যে, তাঁর স্কার্টের তলায় নীচের জামার অংশ দেখা যাচ্ছে. শাইখেত ছবিটি ছিঁড়ে ফেলে দিলেও এমন এক জন জুটে গিয়েছিল, যে এই ছেঁড়া টুকরো জোড়া লাগিয়ে, তার নীচে "দেখুন কি রকম ভাবে বিশ্বের বিপ্লবের নেতাদের ছবি তোলা হয়" লিখে সেই সব লোকেদের হাতে তুলে দিয়েছিল, যারা ফটোগ্রাফার কে ধরে জেলে পুরে দিয়েছিল. শাইখেত মনে করেছেন যে, তাঁর তাও ভাগ্য ভাল, কারণ এমন সব প্রভাব শালী বন্ধু ছিল, যাঁরা তাঁকে জেল থেকে উদ্ধার করতে পেরেছিল. তার পর থেকে তাঁর ছবির বিষয়ে নিখুঁত হওয়া একটা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল. ফোটো বিয়েনালে তে দেখানো হয়েছে তাঁর ১৯২০ এর দশকে তোলা ছবি, যখন তিনি তখনকার খুব জনপ্রিয় "আগানিওক" নামের ম্যাগাজিনের রিপোর্টার ছিলেন. আর্কাদি শাইখেত তখন সদ্য পেশায় যোগ দিয়েছেন, তখনকার বিখ্যাত ফোটো গুলির মধ্যে ইলিচের ল্যাম্প নামের ছবিটি আজও স্মরণীয়, যেখানে দু জন কৃষক একটা ইলেকট্রিক বাল্বের নীচে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছে….

ফোটো রিপোর্টের ধরনে আজ কাজ করছেন পের্ম শহরের গুণী ফটোগ্রাফার আন্দ্রেই বেজউক্লাদনিকভ. তিনি ১৯৮০ র দশকের শেষে সোভিয়েত দেশে শুরু হওয়া পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনোস্ত এর সময়ের ছবি তুলেছেন. তাঁর কথা মতো, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সময় এসেছে সব পরিস্কার করে দেখতে পাওয়ার এবং তাঁর সামনে সময় ভবিষ্যতের জানালা খুলে দিয়েছিল. আন্দ্রেই বেজউক্লাদনিকভ সব কিছুরই ছবি তুলেছেন, যা দেখেছেন চারপাশেঃ রাস্তা, লোকজন, নিজের বন্ধু বান্ধব – অভিনেতা, সঙ্গীত শিল্পী, কবি ও শিল্পী সবাইকে. তিনি বলেছেনঃ

"আমি মনে করি, প্রত্যেক ফটোগ্রাফার তাঁর চারপাশের জীবনের ছবি তুলতে বাধ্য, কারণ এমনকি সবচেয়ে ছোট একটা গুবরে পোকাও সময়ের সাথে ঐতিহাসিক ভাবে মূল্যবান জিনিসে পরিণত হয়. আর আমার ইচ্ছে হল, সেই সময় টাকে বন্দী করে রাখা, যা আমাকেই ঘিরে ছিল, যখন আমার মনে হত জীবনে আগ্রহের মতো বিষয় আছে".

পঁচিশ বছর পার হওয়ার পর আন্দ্রেই বেজউক্লাদনিকভ এর ছবিকে এখন বলা হয় "নতুন রাশিয়ার জন্মের ফোটো ইতিহাস".