উনবিংশ শতকের কবি ফিওদর ত্যুতচেভ লিখেছিলেন "বুদ্ধি দিয়ে রাশিয়াকে যায় না যে বোঝা" – এই সমর্থন যোগ্য উক্তিটি যদিও অসংখ্য বার নানা জায়গায় উদ্ধৃত করা হলেও রাশিয়ার বর্তমানের ঐতিহাসিক, দার্শনিক, সাংবাদিক ও লেখকেরা চেষ্টা করেই চলেছেন দেশের অতীত, বর্তমান সব কিছুকে বোঝার চেষ্টা করে ভবিষ্যতের ঘোমটা খুলে উঁকি মেরে দেখতে. এই রকম সাহিত্যের এক প্রসারিত নমুনা ১৫ই মার্চ শেষ হওয়া "রাশিয়ার বই" নামের জাতীয় বইমেলাতে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল.

    এই সব বইয়ের মধ্যেই রাশিয়ার সাংবাদিক, বহু ভাষা বিদ ভ্লাদিমির মেদিনস্কির লেখা "রাশিয়ার সম্বন্ধে বানানো কথা" নামের বইয়ের সিরিজের বেশ কয়েকটি নতুন বই দেখতে পাওয়া গেল. এর মধ্যে ছিল "রুশ লোকের মাতলামি, কুঁড়েমি ও নিষ্ঠুরতা" এবং "রুশ দাসত্ব, নোংরামি ও জাতির কারাগার", এই বই দুটি এর মধ্যেই নন ফিকশন সাহিত্যের বিভাগে বেস্ট সেলারে পরিণত হয়েছে এবং এক তর্ক বিতর্কের ঝড় তুলেছে. প্রদর্শনীতে এর অডিও ভার্শন প্রকাশ করা হয়েছে. লেখক বাস্তব তথ্যের উপর ভিত্তি করে রাশিয়ার সম্বন্ধে নেতিবাচক কালো গল্প কথার অবসান করতে চাইছেন. ভ্লাদিমির মেদিনস্কি লিখেছেন রুশ দেশ সম্বন্ধে যে "প্রাগৈতিহাসিক নোংরা ধারণা সারা বিশ্ব জুড়ে এমনকি দেশের মধ্যেও ছড়ানো হয়েছে. তার একটা ঐতিহাসিক পর্যালোচনার সময় হয়েছে". লেখকের মতে, টিকে থাকার মত জোর আছে এমন সব বানানো ধারণা – দেশের সভ্য ভবিষ্যতের এগিয়ে চলার পথে এক জলে ডোবা নীতিগত মাইন. কিন্তু কি করে এই সব বানানো কথার উত্পত্তি হয়েছে?

    "নানা ভাবে – বলেছেন রাজনৈতিক পর্যালোচক ও নিজেই ব্যাখ্যা করছেন যে, এমন সব বানানো কথা আছে, যা তৈরী করার জন্য অনেকে রীতিমত ভাবে. একটা ক্ল্যাসিক্যাল নমুনা হল – রুশ দেশের থেকে বিপদের ভয়. এইটাই হল অ্যাংলো – স্যাক্সন ধারণার ভিত্তির জন্য কল্পিত ধারণা. এই ধারণা রাজনীতিবিদদের জন্য লাভজনক, সামরিক শিল্পোত্পাদনের ব্যবস্থার সহায়ক, সরকার গুলির দরকারি, এর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ. এটা এক বিভাগের বানানো কথা, আর একটা আপনা থেকেই বানিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সব চেয়ে দুঃখের হল আমরা রাশিয়ানেরা তা বিশ্বাস করে বসে আছি".

    বইয়ের অন্যান্য বিষয় – অবোধ্য রুশ আত্মা ও অসীম ধৈর্য্য, কুঁড়েমি, চৌর্যবৃত্তি, নিষ্ঠুরতা… অথবা বিখ্যাত (কুখ্যাত) রুশ মাতলামি.

    "যখন ঐতিহাসিক মাতলামি নিয়ে কথা ওঠে ভ্লাদিমির মেদিনস্কি বলেন – এটাও মিথ্যে কথা. ১০০ বছর আগে রাশিয়া বিশ্বের সমস্ত দেশের মধ্যে অ্যালকোহল ব্যবহারে ছিল তালিকার শেষ থেকে দ্বিতীয়, রাশিয়ার চেয়ে কম পান করত শুধু নরওয়ে! আমাদের দেশ উনবিংশ শতকের শেষ অবধি বলা যেতে পারে বাস্তবেই সুস্থ দেশ ছিল, যখন থেকে দেশের কাঠামো ভেঙে চাষীরা শহরে আসা শুরু করল, যখন কঠোর পরিশ্রমের পর আর কোন রকমের বিশ্রামের বা আনন্দের বন্দোবস্ত নেই তখন থেকেই জনতা মদ ধরল. কবরের শেষ পেরেক পোঁতা হয়েছিল পেরেস্ত্রোইকার সময়ে ১৯৯০ সালে".

    এই প্রসঙ্গে ভ্লাদিমির মেদিনস্কি উল্লেখ করেছেন যে, উনবিংশ শতকের বিখ্যাত ইতিহাস লেখক নিকোলাই কারামজিন ও লক্ষ্য করেছিলেন যে, রুশ লোকের একটা আত্ম অবমাননা করার প্রয়াস আছে, ভ্লাদিমির মেদিনস্কি মনে করেন আজও কারামজিন এর সময়ের মতোই দেশের ইতিহাসের একটা সঠিক মূল্যায়নের প্রয়োজন, যাতে জাতির আত্ম সম্মান বোধ প্রখর হয়.

    তিনি বলেছেনঃ "ইভান গ্রোজনির সময়ের সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর তুলনা করা উচিত্ হবে না, তার মধ্যে যখন মানবিক অধিকার নিয়ে হেলসিংকি ঘোষণা গ্রহণ করা হয়েই গেছে. রাশিয়ার জারকে তাঁর সমসাময়িক দের সঙ্গেই তুলনা করতে হবে, অষ্টম হেনরি বা ফরাসী রাজা যাঁরা বার্থোলোমিউ রাত্রির সময় শাসন করেছেন, তাঁদের সঙ্গে. আর তখন দেখা যাবে যে, গ্রোজনি, যদিও তাঁর প্রতি সহানুভূতি খুব একটা জাগে না, তাও তাঁর সমসাময়িক দের চেয়ে বলা যেতে প্রায় মাদার টেরেসার মত দয়ালু. গ্রোজনি আর ইংল্যান্ডের এলিজাভেতা – এই দুজনকে বিচার করে দেখুন. ইংল্যান্ডের লোকেরা এলিজাভেতা র শাসন কালকে বলছে সোনার সময় নাম দিয়ে সিনেমা তুলছে, কিন্তু তিনি তাঁর শাসন কালে গ্রোজনির দশ গুণ বেশী নিজের দেশের লোক হত্যা করেছিলেন".

    মনে হয়েছিল এই বই বোধহয় সেই সব বিদেশীদের জন্য লেখা হয়েছে, যারা এখনও বিশ্বাস করে যে রুশ ইতিহাস সব চেয়ে নিষ্ঠুর ও রক্তাক্ত, রুশীরা সকালে উঠে দাঁত মাজে না আর সামোভার থেকে ভোদকা ঢেলে খায়, তাই ভ্লাদিমির মেদিনস্কি উল্লেখ করেছেন যে, "এই বই আমাদের নিজেদেরই বেশী দরকার – যাতে আমাদের ইতিহাসের চারপাশে পড়ে থাকা থুতুর মধ্যে থেকে সত্যের বীজ আলাদা করা সম্ভব হয়".