চীন আর্কটিক অঞ্চলে নজর দিয়েছে. বেইজিং শহরে মনে করা হয়েছে যে, বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং ফলশ্রুতি হিসাবে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া খুব কম অর্থনৈতিক লাভ দেবে না. কারণ আজকের দিনে প্রাথমিক মূল্যায়ণ করার পরেই দেখা গেছে আর্কটিক অঞ্চলে বিশ্বের ১৩ শতাংশ এখনও অনাবিস্কৃত খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার রয়েছে. এ ছাড়া কয়লা, সোনা, রূপো, হীরে, টাইটানিয়াম, তামা ও আরও অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ আছে এখানে. চীনে হিসেব করে দেখা হয়েছে যে, বরফ গলে গেলে এই সম্পদের কাছে পৌঁছনো যাবে, আর তার মানে হল এখনই সময় এসেছে আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের খুঁটি শক্ত করে ফেলার. কিন্তু একই সঙ্গে যখন সব গলে যেতে শুরু করবে, তখন আর্কটিক অঞ্চলে গরম কালে জাহাজ চলাচল করতে পারবে, আর এটা আরও একটা লাভজনক ব্যাপার – নতুন সাংহাই থেকে হামবুর্গ পর্যন্ত জাহাজ চলাচলের রাস্তা হবে. বর্তমানের সুয়েজ চ্যানেল হয়ে যাওয়ার রাস্তার থেকে কম দূরত্ব পড়বে, তার ওপরে এই রাস্তায়চলা৪চলের বিপদ কম, কারণ সোমালির জলদস্যূরা এত দুরে আসবে না আর সস্তা, কারণ জলদস্যূ উপদ্রবের জন্য বর্তমানে জাহাজের বিমা দশ গুণ দামী হয়ে গিয়েছে. চীনের অর্থনীতি খুবই বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর অনেকটাই নির্ভর করে, তাই নতুন সমুদ্র পথ পাওয়ার সুযোগ তারা ছাড়তে চাইবে না. চীন এই সব বিষয় নিয়ে এখনই মাথা ঘামাতে শুরু করেছে, কারণ পরে তা দেরী হয়ে যাবে. সত্য যে, এখন এই বিষয় যথেষ্ট সমস্যার বটে. বোঝাই যাচ্ছে যে, পাঁচটি আর্কটিক অঞ্চলের দেশ, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে ও ডেনমার্ক চুপ করে বসে নেই, আর এখনই নিজেদের উত্তরাঞ্চলের ভাগের অংশ বুঝে নিচ্ছে. কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের চাপে পড়ে এই সব দেশেরা তাদের উত্তরের অনুসন্ধানের বিষয়ে মৌণ ভূমিকা নিয়েছে দেখে আপাতঃ উন্নতিশীল চীন শুধু অর্থনৈতিক ভাবে না হয়ে ভৌগলিক ভাবেও বিশ্বের সব দেশকে পার হয়ে এগিয়ে থাকতে চাইছে. সুদূর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের উপ প্রধান সের্গেই লুজিয়ানিন এই রকম মনে করে বলেছেনঃ

অদূর ভবিষ্যতে চীনের উত্তর দিকে আর্কটিকের অনুসন্ধানের কাজ চলবে খুব বেশীর দিকে, কারণ ওদের লোভ বেড়েছে, ক্ষমতাও হয়েছে. শুধু বিজ্ঞান সাধনা বা পরিস্কার জ্ঞানের জন্যই নয়, ওরা চাইছে আমাদের পৃথিবীর উত্তরে নিজেদের প্রথম কলোনি তৈরী করতে. এটাকে একদিকে প্রসার করা বলা যেতে পারে না, কারণ সাধারন ভাবেই বিশ্বের বিশাল দেশ গুলি এই কাজ করে থাকে, আর চীন তো আর শুধু কোন কারণ ছাড়া বলছে না যে, তারা আজ আমেরিকার সমান, কাজে প্রমাণ করে দিচ্ছে, আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করে. তাই এটাকে চীনের প্রসার বৃদ্ধি না বলে বলা উচিত্ হবে চীনের বিশ্ব জোড়া দেশ হওয়ার নতুন গুণগত পরিবর্তন.

আর্কটিকে নিজেদের জায়গা দখল করে এই নতুন ক্ষমতার প্রমাণ দেওয়া বেশ দেখবার মত হয়েছে. কিন্তু পূর্ব্ব দেশের জ্ঞানীরা বলেছেনঃ কাজ করতে হবে খুব সাবধানে, যাতে অন্য দেশগুলির মনোভাব না পাল্টায়. তাই চীনের সরকারের কর্মীরা চুপ চাপ বসে আছে আর দিন গুনছে. সমস্ত বড় রকমের ঘোষণার দায় ভার তারা দেশের বিজ্ঞানীদের উপরেই ছেড়ে দিয়েছে. তারাই এই সব নতুন সব স্লোগান বানিয়েছেন – যারা আর্কটিক সমুদ্র দিয়ে নতুন বাণিজ্যের পথ দখল করবে, তারাই বিশ্ব অর্থনীতির নতুন পথের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে. বেইজিং থেকে পাওয়া এই সব ঘোষণা মন দিয়ে শোনা উচিত্ বলে মনে করে রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর সদ্য ও প্রতিনিধি ভাসিলি মিখিয়েভ বলেছেনঃ

চীন নিজেদের উপর বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্কটের আঘাত শুধুমাত্র নিতে পারে নি, বরং এই সুযোগে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার প্রচেষ্টা করতে ছাড়ে নি. চীন প্রায় তিনশ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন পথে বিশ্ব অর্থনীতিতে লগ্নী করেছে. এই সব মিলিয়ে চীন হয়ে উঠেছে লক্ষ্যনীয় এবং বড়. চীনের বর্তমানে সুযোগ হয়েছে বিশ্বে নিজের স্বার্থ দেখার. আর নানা রকমের অনুসন্ধানী লোকেরা এটা দেখতে পাচ্ছেন এবং এটা বুঝতে পারছেন.

আর চীন নিজে মন দিয়ে রাশিয়ার কাণ্ড কারখানা দেখছে, যারা নিজেদের আর্কটিক অঞ্চলের অংশের দাবী করেছে. মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে, রাষ্ট্রসংঘ এই দাবীর বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করবে ২০১৪ সালে. আর ভবিষ্যতে আর্কটিকের কেকের টুকরোর দাবী নিয়ে আরও দেশ আসতে পারে. কিন্তু দাবী তো দাবীর পথেই থাকবে, বাস্তব থেকে কেউ কোথাও পালাতে পারবে না. বাস্তব দেখিয়েছে যে, বেইজিং এত সব ঘোষণা স্বত্ত্বেও সে রকম কেন জাহাজ নেই যা উত্তরের সমুদ্র পথে চলতে পারবে. আর রাশিয়ার এর মধ্যেই এই রাস্তা ব্যবহার করে দেখার ইচ্ছা রয়েছে. এই আসন্ন গরমেই রাশিয়ার ট্যাঙ্কার খনিজ তেল নিয়ে দুটো বরফ ভাঙতে পারে এমন জাহাজ সাথে নিয়ে আর্কটিক বরফ ঢাকা সমুদ্র পার হয়ে ভিতিনো বন্দর থেকে জাপান অবধি যাবে. অর্থাত্ উত্তরের পথ হতে পারে ভাসমান তেল পরিবহনের পথ. এই পথ সবার জন্যই খোলা থাকবে, কিন্তু জাহাজ গুলি রাশিয়ার সমুদ্র পরিবহন ও পরিবেশ সংরক্ষণের আইন মেনে চলতে বাধ্য হবে.