আফগানিস্থানের দক্ষিণে তালিবান বিরোধী সামরিক আক্রমণ মশতারাক চলছে. এই আক্রমণের মুখ্য ভূমিকা দেওয়া হয়েছে আমেরিকা – ন্যাটো সৈন্য বাহিনীকে. এই আক্রমণের আগে প্রচুর ভাবে জনতার কাছে প্রচার করা হয়েছে যে, এবারে তালিবানের পাঁজর ভেঙে দেওয়া হবে. বর্তমানে আক্রমণ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পরে পশ্চিমে যথেষ্ট বিনীত ভাবে এর সাফল্য নিয়ে কথা বলা হচ্ছে. আমেরিকার সামরিক বাহিনীর প্রধানদের কেন্দ্রীয় পরিষদের প্রধান জেনেরাল পেত্রেউস বলেছেন যে, আফগানিস্থানের দক্ষিণে তালিবদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চলতে পারে দেড় বছরেরও বেশী. কিন্তু খেয়াল করার মত ব্যাপার হল অন্য. মশতারাক শুরু নিয়ে জন প্রচার আর ন্যাটো জোটের গুরুদের দল সারা দুনিয়া জুড়ে বিভিন্ন দেশে যাওয়া শুরু করেছে প্রায় একই সময়ে. তাঁরা তখন অবধি পুরো তৈরী না হওয়া ন্যাটো জোটের নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে খুবই প্রশংসা করে বেড়াচ্ছিলেন. এই পরিকল্পনা জোটের লোকেরা অনুমোদন করতে এখনও বছর শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হবে. এই নতুন স্ট্র্যাটেজির মূল নীতি কি আর তার সঙ্গে আফগানিস্থানের ঘটনার কোন যোগাযোগ আছে কি না, এই রকম একটা প্রশ্ন নিয়ে আমরা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ভিক্তর নাদেইন রায়েভস্কির কাছে মন্তব্য করতে অনুরোধ করেছিলাম, তিনি নব্বই দশকের প্রথম অর্ধে রোমের ন্যাটোর সামরিক কলেজে লেকচার দিতেন. তিনি বলেছেনঃ

"সোভিয়েত দেশ ভেঙে যাওয়ার পরে ন্যাটো জোটের কর্ম কর্তারা নতুন শত্রুর খোঁজ করতে লেগে ছিলেন, কারণ ন্যাটো জোটই তৈরী হয়েছিল সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, কিন্তু নব্বই এর দশকে ন্যাটো জোটের ইউরোপের বাইরের অঞ্চলের দায়িত্ব সম্বন্ধে পরিস্কার কোন কর্মসূচী ছিল না. বর্তমানে ন্যাটো ঘোষণা করছে যে, তারা সারা বিশ্বকেই এই দায়িত্ব পালনের অঞ্চলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে তৈরী এবং নিজেদের বিচার অনুযায়ী যে কোন জায়গাতেই সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে তৈরী. ন্যাটো জোট নিজেদের জন্য বিপদের তালিকা বাড়িয়েছে, সন্ত্রাসবাদী হানা ছাড়া সেখানে যোগ করা হয়েছে গণহত্যার অস্ত্র প্রসার রোধের ব্যবস্থা করা, আঞ্চলিক, জাতিগত এবং ধর্মীয় বিরোধের মোকাবিলা, যে কোন দেশে পরিস্থিতি অশান্ত হওয়া, জ্বালানী সরবরাহ নিয়ে সঙ্কট অবস্থার সৃষ্টি".

আফগানিস্থানে ন্যাটো জোট এক যুদ্ধে ব্যস্ত রয়েছে, যা আজ আট বছর ধরে চলছে, আফগানিস্থান ন্যাটো জোটের দায়িত্বের অঞ্চলের মধ্যে পড়ত না, সুতরাং দেখাই যাচ্ছে যে, ন্যাটোর নতুন স্ট্র্যাটেজি, যা নিয়ে এখনও শুধু আলোচনা চলছে, তা কি এর মধ্যেই আফগানিস্থানের জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে? এটা কি তাই দাঁড়াচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তরে আফগানিস্থান, ভারত ও পাকিস্থানের সমস্যা সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিমির সোতনিকোভ বলেছেনঃ

"ন্যাটো জোটের দায়িত্বের আওতায় সারা দুনিয়া বহু দিন ধরেই রয়েছে, প্রথমে পূর্ব্ব ইউরোপের দেশ গুলি তাদের খপ্পরে পড়েছে, তারপর শক্তি প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে যুগোস্লাভিয়া কে বশে আনতে. তারপর জোট ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে বেরিয়েছে. তারা ইরাকে আমেরিকার সেনা বাহিনীকে সাহায্য করেছে, তারপর সোজা আফগানিস্থানের যুদ্ধে যোগ দিয়েছে".

দেখাই যাচ্ছে যে, ন্যাটো জোট ইউরোপের বাইরে শুধু প্রচার কার্যেই ব্যস্ত নেই. তারা ইউরোপের বাইরে নিকট প্রাচ্যে দুটি যুদ্ধে যোগ দিয়েছে. তার পরেও নিজেদের কাজ কারবার বাড়াতে চাইছে. ফেব্রুয়ারী মাসের শুরুতে কাতারে একজন ন্যাটো জোটের নেতা সফরে গিয়েছিলেন. তিনি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ গুলির ন্যাটো জোটের সাথে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ছিলেন. কিন্তু প্রশ্ন আসে যে, কোথায় পারস্য উপসাগর আর কোথায় উত্তর অতলান্তিক জোটের অবস্থান, তা নিয়ে. সত্য যে, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির খনিজ তেল আছে, যা পশ্চিমের ন্যাটো জোটের দেশ গুলির নেই, তাই যে সব প্রধান জায়গা তে বেশী পরিমানে তেল ও গ্যাস পাওয়া যায়, সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রচেষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই করছে. আর তা সমস্ত জোটের নীতিতে পরিণত হয়েছে.

    যদি আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, তাহলে ন্যাটো জোটের নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কি বলা যেতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ভ্লাদিমির সোতনিকোভ উল্লেখ করেছেন যে, আফগানিস্থানে ন্যাটো জোটের সামরিক আক্রমণে অংশ নিয়ে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় নি. তালিবান আন্দোলন ধ্বংস করা যায় নি. বরং তাদের বিদেশী সেনা বাহিনীকে দেশের মাটি ছাড়তে বলার আহ্বান আজ আফগানিস্থানের মানুষের সমর্থন আরও বেশী করে পাচ্ছে.

<sound>