'রাশিয়ার পল ম্যাকার্টনি' এবং 'সোভিয়েত দেশের সেক্স সিম্বল' বলে যাঁকে প্রায়ই ডাকা হয়ে তাকে, সেই বিখ্যাত গায়ক ইউরি আন্তোনভ ১৯শে ফেব্রুয়ারী তাঁর ৬৫ তম জন্মদিন পালন করছেন. মস্কোর ক্রেমলিনের সম্মেলন মঞ্চে ২০ শে ফেব্রুয়ারী এই উপলক্ষে সঙ্গীত পরিচালক এবং গায়ক আন্তোনভ এক বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন. তাঁর ফ্যানেরা আবার এই দারুণ সুন্দর মানুষ টিকে গীটার হাতে স্টেজে দেখতে পাবেন.

    ইউরি আন্তোনভের সৃষ্টির প্রভাত হয়েছিল সোভিয়েত দেশের সময়ে, কিন্তু বোধহয় কারও ক্ষমতা হবে না তাকে সোভিয়েত সঙ্গীত স্রষ্টা বলার. প্রসঙ্গতঃ সেই সময়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মীরা আন্তোনভ কে সুর কার বলে মানতেই চাইতেন না, "একে তো স্রেফ বায়ান নামের রুশ গীটার বাজানোর শিক্ষা টুকু তিনি পেয়েছিলেন এক সঙ্গীত শিক্ষা সদনে, তার ওপরে কাজ করেন খুবই কম গুরুত্বপূর্ণ গান বাজনার দলে. এ আবার কি রকম সুর কার হল"? আন্তোনভের কিন্তু এই নিয়ে একটুও খেদ ছিল না, কারণ তাঁর গান তখন লোকের মুখে ফেরে. তাঁকে প্রায়ই সরকারি লোকেরা মনে করিয়ে দিত, "এই সব বিরহ বেদনার গান না লিখে একটা জাতীয় সঙ্গীত হতে পারে এমন দেশাত্মবোধক গান লিখলেও তো হয়". কিন্তু বলাই হয় যে, "কোকিল তো আর কারও হুকুমে ডাকে না". আর বিনা হুকুমে, স্রেফ নিজের মনের টানে আন্তোনভ নিজের দেশ নিয়ে, দেশের সৈনিক দের নিয়ে, যাঁরা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ফ্যাসিস্ট দের থেকে রক্ষা কারী দের নিয়ে একের পর এক গান লিখেছেন…

    আজ সোভিয়েত সময় মনে করে ইউরি আন্তোনভ বিনা অতীতের প্রতি মমতায়, বিনা ক্ষোভে, সামান্য ব্যঙ্গের সুরে বলেছেনঃ

    "আমি সোভিয়েত দেশের প্রথম পপ সঙ্গীত গায়ক যাকে ক্রেমলিনের সম্মেলন মঞ্চে ডাকা হয়েছিল অক্টোবর বিপ্লবের বর্ষ পূর্তি উত্সবে. তখন গরবাচভ সরকারি উচ্চ পদস্থ নেতাদের ব্যালকনি থেকে নেমে এসে প্রথম সারি তে বসে ছিলেন. এটা এতই গণতান্ত্রিক ব্যাপার ছিল যে, চোখে না দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না. আমি নতজানু না হয়েই একা স্টেজে গীটার হাতে উঠেছিলাম. তার আগে ক্রেমলিনের সম্মেলনের মঞ্চে অনুষ্ঠানের জন্য কোন ব্যবস্থা ছিল না, ছিল শুধু সম্মেলনের জন্য. পপ গায়ক, যার গানের জন্য বাজনার আগে থেকে করা রেকর্ড দরকার, তা সে শুনতেই পায় নি. আমি একটু আগে গান ধরে ফেলেছিলাম, এটা আমার জন্য একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল. কিন্তু পরে আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম, আর সব মিলিয়ে শেষ অবধি ভালই হয়েছিল. যখন বাড়ী ফিরে ছিলাম, তখন মা আমাকে বলেছিলেন, যে আমি কি রকম একটা অদ্ভূত ভাবে গান গেয়ে ছিলাম সে দিন. আমি বলে ছিলাম, খুব ভয় পেয়ে গিয়ে ছিলাম".

    আজ ইউরি আন্তোনভ কে এখন কার নিয়মিত পপ গায়কদের ভীড়ে দেখা যায় না, বড় লোকেদের অনুষ্ঠানেও তিনি থাকেন না. মন্দ লোকে বলে তিনি নাকি লোকজন পছন্দ করেন না, শহরতলির বাড়ীতে এক গাদা কুকুর বিড়ালের মধ্যে নিজের মনোযোগ দিতেই ভাল বাসেন. কিন্তু তিনি আসনে স্রষ্টা, যিনি গোপনে রুদ্ধ দ্বারের পিছনেই সৃষ্টি করতে ভালবাসেন. তাঁর কাছে শুধু সব সময়েই চাই বড় পিয়ানো এবং রেকর্ড করার যন্ত্র পাতি. কারণ সঙ্গীত তো আর সময় ধরে আসে না, সুর নিজেই ঠিক করে কখন উদয় হবে নিজে থেকে, সুর কার বলেছেন এই কথারই প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত 'দুঃখ থেকে আনন্দে' গানটির তৈরীর ইতিহাস নিয়ে.

    "কবি বরিস দুবরোভিন আমাকে একটা নাম হীণ কবিতা দিয়েছিলেন. কথা আমার পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু ওটা পাশে সরিয়ে রেখে কিছু দিন একদম ভুলেই ছিলাম. প্রায় পনেরো বছর এই করে কেটে গিয়েছিল, যখন আবার কাগজ টা খুঁজে পেয়েছিলাম, তখন সেটা একে বারে হলুদ হয়ে গিয়েছে. আর তখন আমি এই 'দুঃখ থেকে আনন্দ' নামের গান টায় সুর দিয়ে ছিলাম".

    ইউরি আন্তোনভ আগের মতই গান লেখেন, কিন্তু ইচ্ছে করেই নতুন গানের অ্যালবাম লুকিয়ে রাখেন, যাতে পাইরেট রা তাঁর গানের দখল না নিতে পারে. তিনি বলেছেনঃ

    "আমি একটা নিজের তৈরী নীতি নিয়ে চলেছি, তাতে খানিক ফলও পেয়েছি.আগে সারা দেশের যে কোন জায়গায় আমার গানের পাইরেটেড ডিস্ক পাওয়া যেত, তারপর অর্ধেক জায়গাতে তা পাওয়া যেতে লাগল, আর এখন পেতে হলে খুঁজতে হবে".

গায়ক, সুরকার ও স্বেচ্ছায় গৃহ বন্দী ইউরি আন্তোনভ নিজের ৬৫ বছরে এখনও আগের মতই, যখন তাঁর প্রথম জীবনে 'তোমার চেয়ে সুন্দরী আর কেউ নেই' নামের গানে তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন, তেমনই বিশাল হল ভর্তি লোক জড় করতে পারেন, তাঁর গান দিয়ে. (sound)