রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার এক বছর হল. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ পদে তিনি বহাল হয়েছেন সরকারি ভাবে ২০ শে জানুয়ারী ২০০৯. এই সময়ের মধ্যে তিনি কিছুটা রেটিং বা জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন, তাঁর নির্বাচনী আশ্বাসের বিশেষ কিছুই তাঁর পক্ষে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয় নি. কিন্তু আপাততঃ তাঁর প্রতি জন সমর্থন যথেষ্ট বেশী, আমেরিকার জনগণ বিশ্বাস করেন যে, বর্তমানের রাষ্ট্রপতি তাঁর ভালর জন্য চিন্তা করে তৈরী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করবেন.

    বলতেই হবে যে, শুধুমাত্র আমেরিকার জনগনই বারাক ওবামার আদর্শে বিশ্বাস করেন নি, আন্তর্জাতিক নোবেল পুরস্কার প্রদান কমিটিও তাঁকে বিশ্বাস করে শান্তি পুরস্কার দিয়েছে, প্রাপক নিজেই বলেছেন এটি আগাম পুরস্কার. কিন্তু সবচেয়ে বড় সন্দেহ বাতিক ওয়ালারাও স্বীকার করেছেন যে, ওবামার পক্ষে বিরাট কোন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ না নিয়েও সম্ভব হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ে অবস্থান ভাল করার, আগের প্রশাসনের যে প্রতিচ্ছবি বিশ্বের কাছে ছিল তা নির্মূল করার. মানবাধিকার ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিষয়ে চাপ কমিয়ে, বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে মানবিকতা ও পরিবেশের সংরক্ষণ বিষয়ে, যা বিশ্বের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ভাল করতে সাহায্য করেছে.

    রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে গুরুত্বও আবার করে দেখা হয়েছে. রিসেট বা পুনরায় শুরু করার কথা ঘোষণা করে ওবামা প্রশাসন রাজনৈতিক মাঠে অন্যান্য সমস্ত বিবাদের উপযুক্ত সমস্যা গুলিকে আলাদা রেখে, সবার আগে দাঁড় করিয়েছে বিশ্ব নিরাপত্তার প্রশ্নকে. সারা বছর ধরেই মস্কো ও ওয়াশিংটনের মুখ্য আলোচ্য বিষয় ছিল স্ট্র্যাটেজিক রণনৈতিক আক্রমণাত্মক অস্ত্রসজ্জার বিষয়ে নতুন চুক্তির খসড়া. ওবামার ইচ্ছানুযায়ী পারমানবিক নিরস্ত্রীকরণ করার প্রচেষ্টা খুবই বেশী করে তাঁর পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে. এই ভাবে সবার হাততালির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে হলেও তাদের বিশ্ব নেতৃত্বের নতুন ধারণাকে বাস্তবায়িত করতে চলেছে বলে মনে করেন জাতীয় স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট মিখাইল রেমিজোভ. তিনি বলেছেনঃ

    এই লক্ষ্য পূর্ণ হতে চলেছে দুটি কারণের সংযুক্ত করণের ফলে. প্রথমতঃ সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রণী প্রযুক্তির ব্যবহারে, খুবই লক্ষ্যভেদ করার উপযুক্ত অস্ত্র নির্মাণে, রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থার গ্রহণে. দ্বিতীয়তঃ আন্তর্জাতিক আইন সঙ্গত চুক্তি ব্যবস্থায়, প্রাথমিক ভাবে রাশিয়ার সঙ্গে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমানবিক ক্ষেত্রে পাল্লা দিতে পারে এমন দেশের পারমানবিক অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে বাধ্য করবে. তাই রাশিয়ার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক রণনৈতিক আক্রমণাত্মক অস্ত্র সংক্রান্ত চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ, তা এক বার সম্পন্ন হলে রাশিয়ার পারমানবিক অস্ত্র বিশেষত তার সংখ্যার বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে. এই বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা যত কঠোর হবে, তত বেশী করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বিশ্বে একাধারে সামরিক প্রভুত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে. এর মানে এই নয় যে, আমেরিকা আগ্রাসনের নীতি চালাবে, কিন্তু এর ফলে তারা বিশ্বের সাধারন রাজনীতিতেও শক্তির অবস্থানে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে. কারণ সাধারন অস্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্ভাবনা এত বেশী যে, পারমানবিক অস্ত্র বিহীণ বিশ্ব বর্তমানের বিশ্বের চেয়ে বেশী করে মার্কিন প্রভাবে থাকবে. বারাক ওবামা সমর্থ হয়েছেন আপাতঃ শান্তির মৌলবাদের সঙ্গে সামরিক প্রভুত্ব ও মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিকে সংযুক্ত করতে, আর নিরীহ ভাবেই সারা বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রভুত্বের লক্ষ্যে পৌঁছতে.

    স্ট্র্যাটেজিক রণনৈতিক আক্রমণাত্মক অস্ত্র সংক্রান্ত নতুন চুক্তি এর আগের চুক্তিটির সময় সীমা পেরোনোর আগেই সম্পন্ন করতে না পারা ওবামার দলের প্রচেষ্টার বিষয়ে ছবিটি সামান্য হলেও খারাপ করেছে, লক্ষ্যে সহজে পৌঁছনো যায় নি, কিন্তু কারোরই সন্দেহ নেই যে, এই চুক্তি ঠিকই স্বাক্ষরিত হবে. আর মস্কোর লক্ষ্য হবে ঠিক করে বুঝতে ও চেষ্টা করতে এর বদলে তারা কি পাবে.

    রাশিয়া ও আমেরিকার অন্যান্য সহযোগিতার বিষয় গুলি, যা গত বছরে স্ট্র্যাটেজিক রণনৈতিক আক্রমণাত্মক অস্ত্র সংক্রান্ত নতুন চুক্তির বিষয়টির তলায় চাপা পড়েছিল, তা বর্তমানে ঢিলেঢালা ভাবেই চলছে. অর্থনৈতিক সহযোগিতা যথেষ্ট দুর্বল, এমনকি বিচ্ছিন্ন করার জ্যাকসন – ভ্যানিক অ্যামেন্ডমেন্ট এখনও ফিরিয়ে নেওয়া হয় নি. আঞ্চলিক সমস্যার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহযোগিতার প্রশ্নে বিশেষত উত্তর কোরিয়া, ইরান, লাতিন আমেরিকা ইত্যাদি বিষয়ে উন্নতি খুবই কম. রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এই বিষয়গুলিতে খুবই পৃথক. সম্ভবতঃ আফগানিস্থান একমাত্র জায়গা যেখানে দুই দেশের লক্ষ্য অনেকটাই এক.

    সুতরাং সেই সব লক্ষ্য, যেখানে দুই দেশের স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্য রয়েছে, তার উপর নির্ভর করে বন্ধুত্ব মূলক সম্পর্ক তৈরী করা সম্ভব. যাই বলা হোক না কেন, এর আগের হোয়াইট হাউসের কর্তার তুলনায় বর্তমান প্রশাসনের নেতা ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করা যথেষ্ট ভাল এবং গঠন মূলক কাজ করা সম্ভব বলে মনে করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ইনস্টিটিউটের  উপপ্রধান পাভেল জোলোতারিয়েভ, তিনি বলেছেনঃ

    রাশিয়ার দরকার হল রাষ্ট্রপতি ওবামার পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে যে ইচ্ছা রয়েছে, তা যেন বাস্তবায়িত হয়. রাষ্ট্রপতি হিসাবে ওবামার প্রথম বছরের ফল দেখতে গেলে তা যেন রাশিয়াকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্মাণে বাধ্য করে, যাতে মস্কো নিজের স্বার্থ বিসর্জন না দিয়ে কোন না কোন ক্ষেত্রে ওবামাকে জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে যথেষ্ট শক্তি বা ক্ষমতা যেন রাখতে পারে, যার ফলে তিনি দ্বিতীয় বারও নির্বাচিত হতে পারেন.

    বারাক ওবামার পরিকল্পনা খুবই দেখা যাচ্ছে লোভনীয়. ইচ্ছা হয় যেন তা বাস্তবায়িত হতে পারে, এর জন্য মার্কিন রাষ্ট্রপতির হাতে অন্ততঃ আরও তিনটি বছর আছে.