১৯৬৮ সালের বিমান দুর্ঘটনায় বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারী ইউরি গাগারীনের মৃত্যুর বিষয়টিতে বর্তমানে নতুন করে আলোক পাত করা হয়েছে. রাশিয়ার সামরিক বিমান বহরের অবসর প্রাপ্ত কর্নেল ইগর কুজনেত্সভের নেতৃত্বে একদল স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বিষয়টি অনুসন্ধান করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ইউরি গাগারীন ও তাঁর সঙ্গে দ্বিতীয় পাইলট ভ্লাদিমির সেরেগীন এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাতে মারা গিয়েছিলেন হঠাত্ করে তাঁদের পাইলটের কেবিনের হাওয়ার চাপ নেমে যাওয়াতে.

    নতুন এই ধারণা এর আগে সরকারি কমিশন দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরেই যে রিপোর্ট পেশ করেছিল, তা বাতিল করে দিয়েছে. তখন মনে করা হয়েছিল যে, প্রশিক্ষণের জন্য যে মিগ -১৫ বিমানটি এই ঘটনায় ছিল. তা বিমানের বাইরের আবহাওয়াতে হঠাত্ করে পরিবর্তন হওয়ার জন্যই ঘটেছে.

    কুজনেত্সভের কমিশন আজ নয় বছর ধরে এই অনুসন্ধানের কাজ করেছে, কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্ঘটনার সময়ের বিমানটির উড়ানের মডেল বানানো হয়েছিল, তা পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, প্রায় চার হাজার মিটার উঁচুতে, পাইলট কেবিনের একটি খারাপ হাওয়া ঢোকার পাইপের জন্য বিমানের ভিতরে বায়ুর চাপ কমে যায়. এই বিমানের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ পত্রে অবশ্য এই রকম যন্ত্রাংশ বিকল হলে কি করতে হবে তা বলা ছিল না. গাগারীন ও সেরেগীন সম্ভবতঃ দ্রুত বিমানটিকে নীচে নামিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, আর তার ফলেই পাইলট দুই জন জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন,. সেই সময়ের চিকিত্সা বিজ্ঞান এই ধরনের পরিস্থিতি সম্বন্ধে জানত না, তাই ফাইটার বিমানটি খুব তীক্ষ্ণ অবস্থান থেকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে না পেরে জঙ্গলের উপর ভেঙে পড়ে.

    কুজনেত্সভ ও তাঁর সহকর্মীরা বিশ্বাস করেন যে, তখন বিশেষজ্ঞরা দুর্ঘটনার কারণ সম্বন্ধে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন নি, তাই অনুসন্ধানের সমস্ত দলিল গোপন করে ফেলা হয়েছিল, আর স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম মহাকাশচারীর অকাল মৃত্যুর চারপাশে নানা রকমের গল্পের সৃষ্টি করেছিল. এমন কি বলা হয়েছিল যে, গাগারীনকে ভিন্ন গ্রহের প্রাণীরা ধরে নিয়ে গেছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশী যে ধারণা পোষণ করা হয়েছিল, তা হল চক্রান্ত. রসকসমস সংস্থার প্রচার সম্পাদক আলেকজান্ডার ভরোবিয়ভ রেডিও রাশিয়া কে দেওয়া একটি সাক্ষাত্কারে মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ

    "ধারণা করা হয়েছিল যে, দেশের নেতৃত্বই গাগারীন কে মেরে ফেলার চক্রান্ত করেছিল, বিশেষত পেরেস্ত্রোইকার সময়ে আমরা এই মত অনেকবার শুনেছি. বর্তমানের যে ধারণা, তা আমার বোধগম্য, তবে অপেক্ষা করা যাক কত দিনে এই ধারণা ভিত্তি আছে বলে প্রমাণিত হয়, তা দেখতে".

    উড়ান অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী কর্মী আরসেনি মিরোনভ মনে করেছেন যে, নানা রকমের অবিশ্বাস্য ধারণা তৈরী হওয়ার পিছনে বাস্তব কারণও ছিল, তিনি বলেছেনঃ

    "যখন এই ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল, বহু লোকই সত্য জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন, কারণ তাঁদের মধ্যে অনেকেই উড়ানের বিষয়ে কি করা উচিত্ তার নির্দেশিকা বানাচ্ছিলেন. সেই বিমানটির মধ্যে কোন ব্ল্যাক বক্স তখন ছিল না, তাই আমরা কিছুই সঠিক ভাবে জানি না, কারণ কোন নৈর্ব্যক্তিক তথ্য আমাদের কাছে নেই".

    বর্তমানের ধারণায় রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা বলতে চেয়েছেন যে, একমাত্র পাইলটের কেবিনের হাওয়ার চাপ কমলে তবেই পাইলটেরা ভুল করতে পারেন ও তার ফলে মৃত্যু ঘটতে পারে. এই ধারণারও প্রয়োজন সব দিক থেকে বিবেচনার, কারণ এর মধ্যেই কুজনেত্সভের বিরোধীরা ধারণা টিকে সন্দেহ করে কথা বলতে শুরু করেছেন. অংশতঃ কি করে দুজন পাইলট এক সময়েই জ্ঞান হারালেন? তাই বর্তমানের ধারণাটি বোধহয় গাগারীনের মৃত্যু রহস্যের কিনারা করবার জন্য শেষ কথা হতে পারবে না.