১৪ ই ডিসেম্বর – নোবেল বিজয়ী আন্দ্রেই সাখারোভ স্মরণ দিবস. ২০ বছর আগে এই দিনটিতে মহা প্রয়াণের পথে বিংশ শতাব্দীর এক অসামান্য পদার্থ বিজ্ঞানী এবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রামী ও যুদ্ধ, হিংসা বিহীণ বিশ্বের ধারণার স্রষ্টা চলে গিয়েছিলেন.

  আন্দ্রেই সাখারোভ গুণী পদার্থবিদ্ এবং সোভিয়েত দেশের হাইড্রোজেন বোমার জনক. প্রশাসনের প্রিয় এবং নিজের জন্য দারুণ ভবিষ্যত গড়তে চলে ছিলেন, কিন্তু একদিন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর সৃষ্টি গণহত্যার কারণ হতে চলেছে. ১৯৫০ এর দশকের দ্বিতীয় ভাগে তিনি শুরু করেছিলেন এই বোমার পরীক্ষার বিপক্ষে প্রতিবাদ এবং তার অল্প পরেই মানবাধিকার প্রসঙ্গে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তিনি রাজনৈতিক দমন ও মৃত্যু দণ্ডের বিপক্ষে ছিলেন. এই সবের জন্যই তাঁকে মস্কো থেকে বিদেশীদের জন্য সেই সময়ে অগম্য শহর গোর্কীতে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল, সেখানে গিয়ে তিনি তিনবার অনশন ধর্মঘট করেছিলেন. প্রশাসন চেয়েছিল যাতে সাখারোভ বিদেশে প্রবাসী হয়ে চলে যান, আর তিনি নিজে বয়স্ক ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে অশক্ত হলেও দেশের গুপ্তচর সংস্থার সমস্ত রকমের চাল উপেক্ষা করে দেশেই থেকে যান. নিজের দৃষ্টিকোণ তিনি কখনোই পাল্টান নি. ১৯৮৫ সালে দেশের প্রশাসনে গরবাচভ নেতৃত্ব দিতে শুরু করলে, রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর সদস্য সাখারোভ অবশেষে নির্বাসন থেকে মুক্তি পেয়ে মস্কো ফেরত আসেন. ১৯৮৯ সালে তিনি রাশিয়ার লোকসভার অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁর কথা বোঝার ক্ষমতা কারোর ছিল না বলে তাঁকে বিদ্রূপ করে বক্তব্য বলতে না দিয়ে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং এই রকম একটি অধিবেশনের পর তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান.

আজ অনেকেই বলে থাকেন যে, আন্দ্রেই সাখারোভ তাঁর উপযুক্ত সময়ের আগেই বেঁচে ছিলেন. মস্কোর মানবাধিকার সংক্রান্ত হেলসিঙ্কি গ্রুপের বিখ্যাত মানবাধিকার রক্ষক ভালেরি বোরশেভ, যিনি ১৯৭৫ সালে সাখারোভের সঙ্গে একসাথে সোভিয়েত রাজনৈতিক বন্দীদের ভাগ্যের তখনকার জন্য বেআইনি ইতিহাস লিখেছিলেন, তিনি বলেছেন, সাখারোভ ছিলেন অসীম কালের মানুষ. তিনি আরও বলেছেনঃ

"যখন ১৯৭৫ সালে আমার তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, তখন প্রথমে আমারও মনে হয়েছিল যে, তিনি খুব একটা বাস্তব নিয়ে চিন্তা করা মানুষ নন, যদিও ভুল ভাঙতে খুব একটা দেরী হয় নি. তিনি খুবই মানসিক শক্তির অধিকারী ছিলেন, তাঁর লোককে বোঝানোর ক্ষমতা, তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা, চিন্তার পরিচ্ছন্নতা সুদূর প্রসারিত প্রভাব ফেলত. আর তাঁর মৃদু কন্ঠের বক্তব্য, যদিও তিনি বক্তৃতা দেওয়ার সময় কোন ভাবেই স্বর উচ্চগ্রামে তুলতেন না, তাও তাঁর কথার বিষয় বস্তু ও বিষয়ের প্রতি সততা প্রভাবিত করেছে বহু মানুষকে. তাঁর সব চেয়ে বড় শত্রুও জানত যে, তিনি যা বলেন তা সত্য, সব কথাই তিনি তাঁর অন্তর দিয়ে বলেন, তাঁর বক্তব্যের ভাব অত্যন্ত গভীর এবং তা তিনি নিজে ভাল করেই ব্যক্তিগত বেদনা ও দুঃখের মধ্যে দিয়ে বুঝেছেন. আপনারা জানেন, যখন আমি তাঁকে কথা বলতে দেখতাম, তখন মনে করে বুঝতে পারতাম বাইবেলে কেন লেখা হয়েছে যে, ভগবানের শক্তি ক্ষীণ ভাবেই প্রকাশিত ও সম্পন্ন হয়".

সময় আমাদের ধারণা গুলিকে যে ভাবেই পরিবর্তিত করুক না কেন, আন্দ্রেই সাখারোভ যে ধারণা তে বিশ্বাস করতেন এবং যার রক্ষার জন্য আজীবন লড়াই করে গিয়েছেন, সেই বিবেকের মুক্তির ধারণা, যা তিনি মৃদু কন্ঠে বলে গিয়েছেন এবং যা নিয়ে বাকীরা শুধু কোলাহল করে গিয়েছে, তা চিরকালীণ, তাই তিনি ও মানুষের ইতিহাসে থাকবেন বিবেকের মুক্তির প্রতীক হিসাবে অমর. (sound)