মুম্বাই ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গে আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ মস্কো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইতিহাস বিজ্ঞানের ডি লিট সের্গেই লুনেভ কে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে অনুরোধ করেছিলেন.

আপনি মুম্বাই হামলার বিষয়ে কি বলতে পারেন?

প্রফেসর লুনেভ বলছেনঃ

"মুম্বাই হামলার বছর পূর্তি ভারত পাকিস্থান সম্পর্কের মূল সূত্র সম্বন্ধে ভাবতে বাধ্য করে. অবশ্যই সন্ত্রাসবাদী হামলা ভারত ও পাকিস্থানের মধ্যে গভীর ও মূল বিরোধের বাহ্যিক প্রকাশ. খুবই দুঃখের বিষয় যে বিগত কিছু কাল ধরেই ভারত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী জালের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর সন্ত্রাসবাদী হামলা ভারতে ক্রমাগত হয়েই চলেছে, তার মধ্যে হামলা করছে সেই সব সন্ত্রাসবাদী যোদ্ধা, যারা পাকিস্থান ও আফগানিস্থানে প্রশিক্ষণ পেয়েছে".

এই মুম্বাই ট্র্যাজেডি কি ভারতের জন্য শিক্ষা হয়েছে, আর দুই দেশের সম্পর্কে এর কি প্রভাব পড়েছে?

"মুম্বাই এর ঘটনা থেকে ভারতের সরকার সোজাসুজি কিছু পাঠ পেয়েছে. সরকার জনতার নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য বেশী করে কাজ করতে শুরু করেছে. দিল্লী বুঝতে পেরেছে ঐসলামিক দুনিয়াতে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব প্রসারিত করার সময় হয়েছে এবং যে সব ঐসলামিক দেশ মধ্য পন্থী তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রয়োজন আছে. আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করার জন্য ভারত বর্তমানে অন্যান্য দেশের সঙ্গে জোট সম্পর্ক বাঁধতে শুরু করেছে. এই ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এমনকি চীনের সঙ্গেও, যে চীনের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য প্রশ্নে যথেষ্ট রকমের অমিল রয়েছে, কিন্তু তাও ভারত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের প্রসার রোধ করার জন্য সহযোগিতাতে প্রস্তুত".

আপনি ভারত ও পাকিস্থানের সম্পর্কের ভাব সম্বন্ধে কি বলতে পারেন?

"দুটি একই সভ্যতার কিন্তু বিভিন্ন ধর্ম মতের দেশ. পাকিস্থানের জন্য খুবই জরুরী ঐসলামিক আঞ্চলিক দুনিয়াতে নিজের ধর্মের নামে পরিচয়. আইনের চোখে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ রাজের করা ধর্মের গণ্ডিতে পাকিস্থান ও ভারত নামে দেশ ভাগের ফলে যা হয়েছে, তাতে আমার খুব একটা আশা নেই যে, দুই দেশের সম্পর্ক খুব ভাল হবে. সন্ত্রাসবাদের হানা, কাশ্মীর প্রসঙ্গ খুবই জরুরী. কিন্তু এমন কি এই সব প্রশ্নের সমাধানের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সংস্কৃতি ও ধর্মের ব্যবধানের প্রভাব এসে পড়েছে বলে আমি নিশ্চিত. জওহরলাল নেহরু ও এক সময় বলেছিলেন, কাশ্মীর কোন রোগ নয়, উপসর্গ মাত্র, পাকিস্থানের ভারত বিরোধিতার উপসর্গ. ফলে এই গত ৬০ বছরের ইতিহাসে আমরা দেখতে পেয়েছি খুবই অল্প সময়ের জন্য উষ্ণ সম্পর্ক, বেশীর ভাগ সময়েই ঠাণ্ডা লড়াই. তাই ভারত পাকিস্থান সম্পর্কের একটা মীমাংসা হওয়ার সম্ভাবনা, দুঃখজনক হলেও, এখনও অনেক সুদূর ভবিষ্যতের বিষয়".

অর্থাত্ আপনার অদূর ভবিষ্যতে ভারত পাকিস্থান সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে কোন আশা নেই?

"আমি যা বলতে চেয়েছি, তার মানে এই নয় যে, ভারতের পাকিস্থানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কোন উদ্যোগ নেওয়ার দরকার নেই, দেখা যাচ্ছে ভারত বর্তমানে সক্রিয় হয়েছে. পাকিস্থান ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা লক্ষ্য স্থির করতে পেরেছে. পাকিস্থান কে ভারতের পক্ষ থেকে যে দোষ দেওয়া হচ্ছে যে, এ দেশের সরকার, তার গুপ্তচর সংস্থা ওই সব সন্ত্রাসবাদী দলের পরিচালনা করছে, তা মানতে রাজী নয়. কিন্তু যেটা দুঃখের বিষয়, সেটা হল একই সঙ্গে পাকিস্থানের সরকার দেখাচ্ছে যে তারা নিজের দেশের ভিতরে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে পেরে ওঠার ক্ষমতা রাখে না".

তবুও সারা দুনিয়াতে অপেক্ষা করা হচ্ছে ও আশা ছাড়া হয় নি যে, শেষ অবধি ভারত ও পাকিস্থান তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারবে. কয়েকটি দেশ এই ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতেও চাইছে, যেমন, চীন কিছুদিন আগে এই রকম প্রস্তাব দিয়েছিল. এক সময়ে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রসংঘের সাধারন সম্পাদক, জাপানের সম্রাট. ভারত এই ধরনের প্রস্তাব মেনে নেয় না কেন?

"কারণ হল ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে খুবই কঠিন নীতি নিয়েছে. ভারত মনে করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে শুধুমাত্র দুই দেশই কথা বলবে ও সিদ্ধান্ত নেবে. শুধু একবারই ভারত মধ্যস্থতা করার বিষয়ে প্রস্তাবকে না করে নি. এই ঘটনার প্রমাণ বিখ্যাত 'তাসখন্দ ডিক্রি'. সোভিয়েত দেশের কূটনীতির উচ্চতম বিজয়, যখন ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত দেশ ভারত ও পাকিস্থানের মধ্যে মধ্যস্থতা করেছিল. ভারতের আধুনিক ইতিহাসে এটি আপাততঃ প্রথম ও শেষ ঘটনা".

<audio>