একটা মত আছে যে, কয়েকদিন আগে দক্ষিণ ইরানে "ঝন্দোল্লা" দলের যোদ্ধারা যে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ করেছিল তার কারণ শুধু এই দেশের পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করাই নয়, বরং লক্ষ্য ছিল পাকিস্থান ও ইরানের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ক্ষতি করা, আর বিশেষত ইরান থেকে পাকিস্থানে গ্যাস সরবরাহ করার পাইপ লাইন বসানোর কাজ ভণ্ডুল করা. ইরানের সূত্র থেকে "ঝন্দোল্লা" দলের সঙ্গে আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থার যোগাযোগ থাকার সন্দেহ করা হয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানাই আছে যে, বহুদিন থেকেই এই গ্যাসের পাইপ লাইন বসানোর বিরোধিতা করছে, ইরানের প্রতি শত্রুতা থেকে. প্রথমে ঠিক হয়েছিল যে, ইরান থেকে এই গ্যাসের পাইপ লাইন পাকিস্থান হয়ে ভারতে যাবে. কিন্তু শেষ গ্রাহক, এই প্রকল্পের চুক্তি থেকে বর্তমানে নানা কারণে সরে দাঁড়িয়েছে, অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চেষ্টার কারণেও. আজকের দিনে প্রকল্পের ইরান পাকিস্থান অংশ নির্মাণের বিষয়টি কি বাস্তব? এই প্রশ্নের উত্তরে "রেডিও রাশিয়া" কে দেওয়া সাক্ষাত্কারে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক স্তানিস্লাভ তারাসভ বলেছেনঃ

"আমাদের কাছে বর্তমানে কত গুলি তথ্য আছে? রূপক ব্যবহার করে বললে, যা আঙুলে গোনা যায়? এ গুলি হল এক, ইরান থেকে তুর্কমেনিস্থান পাইপ লাইন, দুই হল, দ্বিতীয় পাইপ লাইন ইরান থেকে তুরস্কের এরজেরুম অবধি. তিন হল, ইরান ও তুরস্কের মধ্যে ইরানের দক্ষিণ পার্স অঞ্চলে প্রাকৃতিক তেল ও গ্যাসের খনির উন্নয়নে সম্মিলিত ভাবে কাজের যে চুক্তি আছে, শেষ হল, আজারবাইজান থেকে ইরানে গ্যাস সরবরাহ করার যে চুক্তি. এই সব দেখলে বোঝা যায়, ইরান বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি করতে পেরেছে বিশেষত জ্বালানী শক্তির ক্ষেত্রে, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রচুর চেষ্টা করে যাচ্ছে ইরানকে একঘরে করে রাখার. আর এই কারণেই আমি মনে করি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা স্বত্ত্বেও ইরান থেকে পাকিস্থান গ্যাসের পাইপ লাইনের কাজও শেষ হবে. অন্য প্রশ্ন হল, কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করেছে. শুধুই কি ইরানের প্রতি বৈরীতার কারণে? কিন্তু পাকিস্থান তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশ ও তাদের তো গ্যাসের দরকার. সমস্ত বিষয়টাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজির উপর নির্ভর করছে. এর মানে হল, বৃহত্ নিকট প্রাচ্য অঞ্চলের সমস্ত গ্যাস ও তেলের উত্পাদন এবং পরিবহনের পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা ও এই অঞ্চলের সমস্ত দেশেই নিজেদের প্রভাব খাটানো. ইরান কিছুতেই এই ছকে পড়তে চাইছে না. কিন্তু বর্তমানে বিশ্বে পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেগেমনি করার রাজনীতি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে. অবশ্যই তাদের সৈন্য বাহিনীর আফগানিস্থান ও ইরাকে থাকায় প্রথমে মনে হয়েছিল খুবই সোজা হবে এই অঞ্চলের ও সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু তা হয় নি. বিশ্বের উপর নিয়ন্ত্রণ করা, বা বৃহত্তর নিকট প্রাচ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা একটি কেন্দ্র থেকে বর্তমানে আর সম্ভব নয়. এখন নতুন কেন্দ্র অথবা নতুন আকর্ষণের কেন্দ্রের উদ্ভব হয়েছে. আমার মতে এমনিই একটি হতে চলেছে নিকট প্রাচ্যে. এই প্রক্রিয়াতে যে দেশ গুলি এগিয়ে এসেছে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইরান ও তুরস্ক. তাদের মধ্যে জ্বালানী শক্তি ও অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতার প্রসার হয়েছে. এই কেন্দ্র শেষ অবধি কেমন হবে, তা একমাত্র ভবিষ্যতই বলবে. কিন্তু এর মধ্যেই সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার যথেষ্ট ওজন বেড়ে চলেছে, এই সংস্থায় চীন ও রাশিয়া ছাড়াও চারটি মধ্য এশিয়ার দেশ রয়েছে. পর্যবেক্ষক হিসাবে মঙ্গোলিয়া ও পাকিস্থান ছাড়াও সেখানে ইরান এবং ভারত রয়েছে. এই সংস্থার কাঠামোর মধ্যেই বড় মাপের জ্বালানী প্রকল্পের কথা হয়েছে, যেমন, আলোচনা হয়েছে রাশিয়া, তুর্কমেনিয়া ও ইরানের গ্যাসের প্রবাহকে একসাথে করে ভারতে পাঠানোর কথা. এই কথা এখনো ভবিষ্যতে চলবে, কিন্তু এই সবের মধ্যে যেটা ইতিমধ্যেই লক্ষ্যনীয় তা হল ইরান ও পাকিস্থান গ্যাস পাইপ লাইন প্রকল্পের কারণ অর্থনৈতিক স্তরেই রয়েছে, কোন হেগেমনি তৈরী করার মতো রাজনৈতিক পরিকল্পনার তা অংশ নয়. এই কারণেই এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে বলেই মনে হয়".