মস্কো শহরে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস সমগ্র প্রকাশ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল. মস্কোর সরকারি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা ইরিনা প্রকোফিয়েভার সম্পাদনায় তাঁর পাঁচ জন ছাত্র ছাত্রী এই বইটি বাংলা থেকে রুশ ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন. বইটির নাম দেওয়া হয়েছে 'ঢাকার ভবঘুরে'. প্রকাশ উত্সবে উপস্থিত ছিলেন বর্তমানে রাশিয়াতে বাংলাদেশের রাজদূত ডঃ সইফুল হক এবং তাঁর দূতাবাসের কয়েকজন বিশিষ্ট কর্মী. এ ছাড়া মস্কোর বাঙ্গালী সম্প্রদায়, রাশিয়ার বিখ্যাত ভারত বিশেষজ্ঞরা, বিভিন্ন উচ্চ মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষিকারা আর যে সব ছেলে মেয়েরা বাংলা শিখছে তারা.

    দেশের প্রধান বই সংগ্রহশালার প্রাচ্য সাহিত্য কেন্দ্রে যেখানে হুমায়ুন আহমেদের এই 'ঢাকার ভবঘুরে' নামের বইটির প্রকাশনা উপলক্ষে উত্সবের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে এই ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছাত্রীদের অনুদিত কয়েকটি বই এবং অন্যান্য নতুন বাংলা বই যা এই লাইব্রেরীতে আছে তার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল. এখানে রুশ ভাষায় অনুদিত হুমায়ুন আহমেদের প্রথম বই 'ভালবাসা বাংলাদেশের থেকে' নামে বইটি দেখা গিয়েছে. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদে শ্রী চৈতন্য দেবের ৮টি শ্লোকের বই 'শিক্ষাষ্টক' বা আটটি শ্লোকে ধর্ম শিক্ষা বইটি ছিল. হুমায়ুন আহমেদের ফোটো ছাড়াও এখানে দুটি ছবি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ছিল, একটি রাশিয়াতে প্রথম রবীন্দ্র রচনাবলী অনুবাদ যিনি করেছেন সেই প্রয়াত গ্নাতুক দানিলচুকের স্ত্রীর আঁকা রবীন্দ্রনাথ ও অনুবাদকদের একজনের আঁকা হলুদ পোষাকে হিমুর কল্পচিত্র. ছাত্রীরা সকলেই হলুদ কামিজ পরে ছিলেন ও সবাইকে হলুদ রংয়ের গলার স্কার্ফ পরানো হয়েছিল. এমনকি বাংলাদেশের রাজদূতও স্কার্ফ পরে ছিলেন. সবাই একে অপরকে প্রথমে প্রশ্ন করেছিল "ছবির এই হলুদ পোষাকের লোকটি কে? হলুদ রংয়ের মানে কি? আমাদের সকলের গলায় হলুদ স্কার্ফের মানে কি"?  

         জানা গেল যে, হুমায়ুন আহমেদের গল্পের হিমু হলুদ রংয়ের পোষাক পরে, ছাত্র ছাত্রীরা তাকে দেখেছে হাসিখুশী মানুষের মত, তাই এঁকেছে সে রকমই. দু বছর আগে প্রকাশিত 'ভালবাসা বাংলাদেশের থেকে' বই প্রকাশের পর থেকেই হিমু পড়ুয়াদের কাছে খ্যাতি পেয়েছে. আর সকলের গলায় হলুদ স্কার্ফ বাঁধার মানে হয়েছিল যে, উপস্থিত সকলেই এই হিমুর নামে ক্লাবের সদস্য. ইরিনা প্রকোফিয়েভার এই ঘোষণা সবাইকে আনন্দিত করেছিল. তিনি বলেছেনঃ

    "হুমায়ুন আহমেদের, বাংলাদেশের ও আমাদের সকলের প্রিয় হিরো হিমুর নামে ক্লাব খোলা হল, প্রথম বইয়ের অনুবাদ প্রকাশের পর আমরা লেখকের সাথেও পরিচিত হয়েছি. তাঁর দ্বিতীয় বই অনুবাদ করা হয়েছে, যেখানে হিমুর সাথে ঘটা নানা অদ্ভূত ঘটনার বিবরণ রয়েছে. তাই আমরাও ঠিক করেছি হিমুর নামে ক্লাব খোলার সময় এসেছে".

         ইরিনা প্রকোফিয়েভা বাংলাদেশের রাজদূতকে এই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হয়ে নতুন অনুদিত বইটির মোড়কের ফিতে কেটে উদ্বোধন করে কয়েকটি কথা বলতে অনুরোধ করাতে তিনি উপস্থিত সকলের সহর্ষ হাততালির মধ্যে তা করতে রাজী হয়ে বলেছেনঃ

    "আমি ও আমার দূতাবাসের সকলেই আজ আপনাদের কাছে উপস্থিত হতে পেরে এবং এই রকম আয়োজন দেখে খুবই খুশী হয়েছি. আমি নিজে রাশিয়া থেকে ডক্টরেট করার পড়াশোনা শেষ করে চলে গিয়েছিলাম বারো বছর আগে. ৯০ দশকের সময় এই দেশে প্রচুর পরিবর্তন হয়েছে, সেই রকম কঠিন সময়ে আপনারা নিজেদের কাজ ঠিকই করে গিয়েছেন, এটা প্রশংসার যোগ্য! আমি জানি আপনাদের বাংলাভাষার বই অনুবাদ করে প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা সহজ কাজ নয়. আজ এখানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিরা উপস্থিত রয়েছেন, এঁরা এই বই প্রকাশের জন্য যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন. ভারত ও বাংলাদেশে আরও অনেক বিখ্যাত লেখক ও কবি রয়েছেন, যাঁরা বাংলাভাষায় লেখেন. যদি আপনাদের ইচ্ছে হয় তাঁদের লেখা বই অনুবাদ করে প্রকাশ করতে, তাহলে বাংলাদেশের রাজদূতাবাসের পক্ষ থেকেও সব রকমের সাহায্য করার আশ্বাস দিচ্ছি. আপনাদের সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ".

    বক্তৃতা পর্ব শেষ হওয়ার পর ছাত্র ছাত্রীরা এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছিলেন. অনুবাদিকা ইউলিয়া কালিনিনা বাংলাদেশে গিয়ে ঢাকা শহরে তার হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প শোনালেন. বাংলা ভাষা, কবিতা, সাহিত্য, কৌতুক ইত্যাদি নিয়ে তাদের ভালবাসার নিদর্শন রেখেছিলেন ছাত্র ও ছাত্রীরা. নানা ভাষার গান ও বাংলা গান অনুবাদে শোনানো হয়েছিল সেই সন্ধ্যায়. এই সব গানের অনুবাদই করেছিল প্রতিভা ধর ছাত্র ছাত্রীরা.