"রেডিও রাশিয়া" তার আশি বছরের জয়ন্তী পালন করছে. ২৯শে অক্টোবর ১৯২৯ দিনটি বিশ্বের রেডিও সম্প্রচারের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে. এই দিনে বিশ্বে প্রথমবার নতুন রেডিও স্টেশনের উদ্বোধনী সঙ্গীত বেজে উঠেছিল. এই ভাবেই প্রথম বিশ্বে বিদেশ সম্প্রচার নামক ধারণার শুরু হয়েছিল. আজ "রেডিও রাশিয়া" রুশী ও অন্যান্য ৩৯টি ভাষায় পৃথিবীর ১৬০টি দেশে প্রতিদিন ১৪৬ ঘন্টা শর্ট ও মিডিয়াম ওয়েভ তরঙ্গে এবং এফ এম, উপগ্রহ নির্ভর চ্যানেল, মোবাইল টেলিফোন নেটওয়ার্কে প্রচার করে. তের বছর হতে চলল ইন্টারনেটের http://rus.ruvr.ru পাতায় মাল্টিমীডিয়া ফরম্যাটে ৩৩ টি ভাষায় রেডিও রাশিয়া পৌঁছচ্ছে ১৪০ টি দেশে – যেখানে দেখা, শোনা এবং প্রয়োজনে মন্তব্যেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে. আজ রেডিও রাশিয়া নতুন স্থান দখল করতে চলেছে এবং উন্নতি বহাল রেখেছে, কারণ তার জন্য বাস্তবের দাবী রয়েছে, এই সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে আজারবাইজানের অন লাইন সংবাদ সংস্থা Trend Life কে রাশিয়ার সরকারি রেডিও কোম্পানী "রেডিও রাশিয়ার" চেয়ারম্যান আন্দ্রেই বিস্ত্রিতস্কি বলেছেনঃ

 প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার মতে বিদেশ সম্প্রচার দীর্ঘজীবী হওয়ার কারণ কি?

"বিদেশ সম্প্রচার অবশ্যই আরও অনেক দিন চলবে, যতদিন নানা ভাষা, নানা দেশ ও নানা রকমের সরকার থাকবে. বিদেশ সম্প্রচারের মানে লুকিয়ে আছে যে বিষয়ের মধ্যে, তা হল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, তা কোন সরকারই হোক, বা কোন সামাজিক গোষ্ঠী হোক, বিশ্বের অন্য দেশ বা সরকার বা গোষ্ঠী কে রাজনৈতিক ভাবে সহমতে আনতে চায়, নিজের দেশের ভাষায় একেবারে উত্স থেকে খবর জানতে চায় এবং চায় সে তথ্য নিয়ে আলোচনা করতে. বিদেশ সম্প্রচার হল আন্তর্জাতিক ভাবে যোগাযোগের একটি উপায়. অন্য প্রশ্ন হল এই সম্প্রচারের চেহারা বা আবরণ কি রকম হবে. আমি ব্যক্তিগত ভাবে ভাবি যে, রেডিও সম্প্রচার আর সব রকমের তথ্য প্রচারের মধ্যে মিশে যেতে থাকবে আর বিশেষ করে আন্তর্জাতিক তথ্যের মাধ্যম ইন্টারনেটের সাথে মিশবে. বিশ্বজোড়া এই জাল আজ প্রযুক্তি এবং মেধার বিষয়ে রেডিও কে প্রতিযোগিতা করতে ডেকেছে, কিন্তু এর মানে নয় যে, আন্তর্জাতিক ভাবে রেডিও হারিয়ে যাবে. সিনেমা যেমন আজও থিয়েটারকে মেরে ফেলতে পারে নি. শুধুমাত্র ভূমিকার বদল হয়েছে".

আন্দ্রেই গিওর্গিয়েভিচ, আজ এক বছর হল আপনি এই কোম্পানীর চেয়ারম্যান পদে আসীন রয়েছেন. এই সময়ের মধ্যে "রেডিও রাশিয়া" আধুনিক মাল্টিমীডিয়া প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে. অনুগ্রহ করে বলুন বর্তমানে "রেডিও রাশিয়ার" শ্রোতা ও গ্রাহক নতুন কি সুবিধা পাচ্ছেন?

"অবশ্যই যত দ্রুত বদলাতে চাওয়া হয়েছে, বাস্তবে তা সম্ভবপর হয় নি. বাইরের থেকে বাধা অনেক. আমরা বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের ফলে বহু সমস্যার সামনে উপস্থিত হয়েছি. কিন্তু এই সমস্যা সব বিদেশ সম্প্রচারের জন্যই একই রকম. আর মাল্টিমীডিয়া প্রযুক্তির বিষয়ে আমরা যা করতে পেরেছি তা হল, আমরা সাইট নতুন করেছি, এই কাজও আমার ধারণার চেয়ে বেশী সময় নিয়েছে, কিন্তু তা এখনও চলছে. আমরা আমাদের ইন্টারনেটের পাতায় নতুন অনেক পরিষেবা সংযোজন করেছি. আমাদের গ্রাহকদের তাতে অনেক সুবিধা হয়েছে. এখন লেখা, ছবি, ভিডিও, ধ্বনিতে খবর যে কোন রকম ফরম্যাটে পাওয়া যায়. পরিকল্পনা রয়েছে "রেডিও রাশিয়া" কোম্পানী এই নতুন সাইটের চারপাশে নানা রকম সামাজিক ইন্টারনেটের সাইটের জাল দেখতে পাবে. সর্বাধুনিক খবর হল আমাদের মোবাইল রেডিও সার্ভিস চালু হয়েছে. এখন সব ভাষায় "রেডিও রাশিয়া" থেকে খবর, যে গুলি থেকে ইন্টারনেট যোগাযোগ পাওয়া যায়, সে রকম মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শোনা যাবে. খুব তাড়াতাড়ি আমরা পরিকল্পনা করছি শব্দ ছাড়া মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফোটো ও ভিডিও দেখানোর ব্যবস্থা করতে. এর জন্য প্রোগ্রামটি আরও আধুনিক করতে হবে, কারণ বর্তমানে এই প্রোগ্রাম টেস্ট করা হচ্ছে. প্রোগ্রাম কাজ করছে, কিন্তু উন্নতি করার এখনও অনেক জায়গা আছে. তাছাড়া "রেডিও রাশিয়া" ডিজিট্যাল হচ্ছে. আমরা এখনই এই ফরম্যাটে প্রচার করতে পারি, প্রচার করার জন্য এটা বিশেষ সমস্যা নয়, কারণ সমস্ত অনুষ্ঠানই তৈরী হয় ডিজিট্যাল ফরম্যাটে. কিন্তু গ্রাহকদের জন্য সমস্যা আছে. কারণ ইউরোপে এবং আরও নানা জায়গায় ডিজিট্যাল ফরম্যাটে সাধারন লোকেরা রেডিও শুনছে খুবই কম. এমনকি ইংল্যাণ্ডে, যেখানে অনেক ডিজিট্যাল সেট বিক্রী হয়েছে, সেখানেও বেশী করে চলছে এফ এম ফরম্যাটে প্রচার. কারণ সেগুলো ব্যবহারের পক্ষে সুবিধাজনক, খুবই উচ্চ মানের এবং সস্তা. আজ জনগনকে তাঁদের জিনিস বদলাতে বলা খুবই কঠিন".

কোম্পানীর প্রগতির ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

"স্বপ্ন দিয়ে শুরু করছি, ইচ্ছা হয় সব ভাষায় ২৪ ঘন্টা জীবন্ত অনুষ্ঠান করার. এটা স্বপ্ন, আর বাস্তব হল তা এখন করা সম্ভব হচ্ছে না. তাই আমরা কয়েকটি প্রধান জায়গায় বেশী করে সাফল্য পেতে চাইছি. যেমন, এফ এম তরঙ্গে প্রচার করতে চাইছি বেশ কয়েকটি দেশের রাজধানীতে – লন্ডনে, কায়রোতে, প্যারিসে, নিউ ইয়র্কে. আমাদের দরকার হল ফল হতে পারে এমন ভাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা".

যদি সম্ভব হয়, তবে "রেডিও রাশিয়া" থেকে অন্য দেশের অন্তর্দেশীয় এফ এম তরঙ্গে প্রচারের উন্নতির বিষয়ে কিছু কথা বলুন.

"আমাদের বর্তমানে বালকান দেশ গুলিতে, আফগানিস্থানে, ইরাকের কুর্দ প্রজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে, অনেক গুলি প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত দেশে এফ এম রেডিও চলছে. আরও অনেক জায়গায় আছে. কিন্তু এখনও অনেক কম, ইচ্ছে হয় এদের সংখ্যা বাড়াতে. কারণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই বিষয় যথেষ্ট সমস্যা সঙ্কুল. তার ওপর সহযোগী সঠিক নির্ধারণ করতে পারা – একটা সমস্যা. তার ওপর এটা খুব সাধারন বিষয় নয়, কারণ সব দেশেরই আভ্যন্তরীন নীতি আছে. অনেক দেশই বিদেশী প্রচার মাধ্যমকে নিজের দেশের ভিতরে ঢুকতে দিতে রাজী নয়. তাই এখানে আমাদের সহযোগী খুঁজতে হয়েছে, যারা আমাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য তৈরী. বাস্তব ক্ষেত্রে এই বিষয়ে কিভাবে এগোনো হবে তা পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছু চুক্তি হয়েছে. বোধহয় কয়েকটা কার্যকরী হবে সম্ভবতঃ আগামী বছরের শুরু থেকেই".

"রেডিও রাশিয়া" প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র গুলিতে প্রচার করে. প্রথমে আমাদের শ্রোতারা "রেডিও রাশিয়ার" অনুষ্ঠান শুনতে পেতেন রুশী ভাষায়, সময়ের সঙ্গে কিরগিজিয়া, মলদাভিয়া, উজবেকিস্থান, আর্মেনিয়া এবং ইউক্রেনের ভাষায় প্রচার করা সম্ভব হয়েছে. এই দেশ গুলির জন্য নতুন কি উন্নতি করার কথা ভাবা হচ্ছে?

"আমরা চাই কমনওয়েলথ অফ ইনডিপেনডেন্ট স্টেটস অন্তর্ভুক্ত সব দেশের জাতীয় ভাষায় প্রচার চালু করতে, তা সত্ত্বেও রুশী ভাষায় প্রচার কমানো হবে না, কারণ এই দেশ গুলিতে অনেক রুশী ভাষায় কথা বলা মানুষ রয়েছেন. আমাদের পরিকল্পনা আছে জর্জিয়ান সহ আরও কয়েকটি ভাষায় প্রচার শুরু করার, বাল্টিক সমুদ্র তীরবর্তী দেশ গুলিতেও প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে".

আজারবাইজান ভাষায় কি প্রচার চালু হবে?

"আমার মনে হয় আগামী বছর অথবা খুব বেশী দেরী হলে পরবর্তী বছরের মধ্যে আজারবাইজান ভাষাতে প্রচার শুরু করা অবধি পৌঁছনো যাবে".

বিদেশ সম্প্রচার তো রেডিও প্রচারের চেযে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বে রাশিয়া সম্বন্ধে ধারণা তৈরী করে এই প্রচার. আপনার মতে এই প্রচার শুনে বাইরের নানা ধরনের লোকেরা নিজেদের জন্য কি প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে পেতে পারে?

"গ্রাহক ও শ্রোতারা সেখানে সব কিছুই খুঁজে পেতে পারেন. রাশিয়ার জীবন কি রকম তার গল্প শুনতে পারেন, এই দেশের বিভিন্ন অংশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অন্যন্য জিনিস সম্বন্ধে জানতে পারেন. এটা তো শুধু রাজনৈতিক প্রচার নয়, এখানে শিল্পী, সাহিত্যিক দের জীবন, রাশিয়ার ইতিহাস সব কিছু সম্বন্ধেই বলা হয়ে থাকে. দ্বিতীয়তঃ রেডিও রাশিয়ার শ্রোতারা দেশের নেতাদের, রাজনীতিবিদ দের বিশ্বের নানা বিষয় সম্বন্ধে মতামত জানতে পারে. রেডিও রাশিয়ার অনুষ্ঠানে দেশের রাজনীতিবিদ, পর্যবেক্ষকদের বিশ্বের নানা মূল সমস্যার বিষয়ে আলোচনা করতে শোনা যায়. আমরা চেষ্টা করে থাকি যাতে "রেডিও রাশিয়া" তথ্যের ভাণ্ডার হয়, যেখানে শ্রোতারা শুধু বর্তমানের খবরই শুনতে পাবেন না, বরং রাজনৈতিক আলোচনা বা বিতর্ক করতে পারবেন, বিশ্লেষণ করে বুঝতে ও বোঝাতে পারবেন. আমাদের রেডিও কোম্পানী শ্রোতাদের রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পেশাদারী মতামত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে. যেমন কোন আমেরিকান ছাত্র, সে যদি রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করে, বা দর্শন কিংবা সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র হয়, সে অবশ্যই "রেডিও রাশিয়ার" অনুষ্ঠান থেকে অনেক ইন্টারেস্টিং তথ্য পাবে. সে রাশিয়ার নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদদের বক্তব্য তাদের মুখ থেকে শুনতে পাবে, দল নেতা বা অর্থনীতিবিদ দের বক্তব্য শুনতে পারবে. আর ধরা যাক জার্মানীর কোন গৃহকর্ত্রী, এখানে রাশিয়ার রান্নার পদ্ধতি সম্বন্ধে জানতে পারবেন, যা আমাদের কাছে সত্যিই আছে অনেক অথবা শুধু রাশিয়ার সামাজিক জীবনের গল্পও শুনতে পারেন. বলা যেতে পারে যে, অনেক সময়ই গৃহ কর্ত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে বেশী অনুসন্ধিত্সু হয়ে থাকেন এবং তাঁদের কাছে রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি সবই আগ্রহের বিষয় হতে পারে. আমার যেমন, নিজের জন্য ইন্টার অ্যাক্টিভ সার্ভিস ভাল লেগেছে, যা "রেডিও রাশিয়ার" ইন্টারনেট সাইটে আছে, সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজ বাড়ী আর বর্তমানের চিত্র সংগ্রহ শালা "হার্মিটেজ নিজে রং করে দেখুন", তা করে দেখা যাবেই বা না কেন? করে দেখতে পারা যাবে কি করলে সুন্দর দেখতে লাগবে. এটা একটা খেলার মত, যা মানুষের সব সময়ই ভাল লেগে থাকে".

বলা কি যেতে পারে যে, "রেডিও রাশিয়া" – বিশ্বের মানুষকে এক করার একটা উপায়?

"সংবাদ মাধ্যমের একটি মূল মন্ত্র হল মানুষকে এক করা, তাঁদের সুযোগ দেওয়া একে অপরের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করার, সহমতে পৌঁছনোর. এই মর্মে অবশ্যই বিদেশ সম্প্রচারের ভূমিকা খুবই ইতিবাচক এবং বিশ্বায়নের পক্ষে".

"রেডিও রাশিয়ার" জয়ন্তী উপলক্ষে ২রা এবং ৩রা নভেম্বর মস্কোতে প্রথমবার বিশ্বের সমস্ত রুশী ভাষার রেডিও স্টেশনকে নিয়ে এক উত্সবের আয়োজন করা হয়েছে. এই রকম একটি উত্সব কি শুধুই জয়ন্তী বছরের সুন্দর উপহার না কি এই ধারণার আরও ভবিষ্যতে উন্নতির পরিকল্পনা আছে?

"আমরা আশা করেছি যে, রাশিয়ার ভাষাতে যে সব রেডিও স্টেশন অনুষ্ঠান প্রচার করে, তাদের ফোরাম স্থায়ী রূপ নেবে. এই উত্সবে আন্তর্জাতিক রুশী ভাষায় প্রচার মাধ্যমের সংস্থা তৈরীর ঘোষণা করা হবে. যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের রেডিও কোম্পানী বর্তমানের সহযোগিতার স্তর থেকে আরও বেশী করে ঘনিষ্ঠ ভাবে সহযোগিতা করার জন্য উপায় পাবে. এটা একটা ক্লাব বলে মনে করা যেতে পারে, যেখানে একে অপরের অনুষ্ঠান বিনিময় করতে পারবে, একই সঙ্গে উন্নতির জন্য প্রচেষ্টা করতে পারবে. বর্তমানে অনেক লক্ষ রুশী ভাষায় কথা বলা মানুষ বিশ্বের নানা জায়গায় আছেন, তাঁরা ভাষার সঙ্গে যোগাযোগ হারাতে চান না. সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস এগুলির সাথে যোগ অনুভব করতে চান. আর তাই আমাদের এই সংস্থা রুশী ভাষার বিশ্বকে একত্রিত ও সুবিন্যস্ত করার জন্য আরও একটি পদক্ষেপ".