"রেডিও রাশিয়া" কোম্পানী ৮০ বছরের জয়ন্তী উপলক্ষে তৈরী হচ্ছে. শ্রোতাদের সাথে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও মনোরঞ্জক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে, যাঁরা বিদেশে প্রচারের ইতিহাসে তাঁদের শ্রোতাদের এক দূরের অজানা দেশের সাথে আলাপ করিয়ে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন. সাংবাদিক মহলে "রেডিও রাশিয়া" কে বলা হয় সাংবাদিক গড়ার কামারশালা. যাঁরা এখানে তাঁদের প্রথম পেশাদারী অভিজ্ঞতা পেয়েছেন. তারাই পরবর্তী কালে খ্যাতনামা হয়েছেন এবং রাশিয়ার সাংবাদিক জগতে "সোনার কলম" বলে পরিচিত হয়েছেন. আর রেডিও রাশিয়ায় বেড়ে ওঠা দের মধ্যে শুধু রেডিও সাংবাদিক দের মধ্যে বিখ্যাত লোকেরাই নন, এমন কি টেলিভিশনের সাংবাদিকরাও রয়েছেন. যাঁরা গত শতকের আশির দশকের শেষে খোল নলচে বদলে পাল্টে দিয়েছেন সোভিয়েত দূরদর্শনকে. আলেকজান্ডার লিউবিমভ এঁদের মধ্যে একজন.

এক অভিনেত্রী ও গুপ্তচরের ছেলে, আলেকজান্ডার লিউবিমভ সন্দেহাতীত ভাবে বাবা ও মা দুজনেরই প্রতিভা বংশ পরম্পরায় পেয়েছেন! দেশের একজন অন্যতম সাংবাদিক হিসাবে তিনি টেলিভিশনের "দৃষ্টিকোণ" অনুষ্ঠানে প্রথম কাজ করা শুরু করেন. আশির দশকের শেষে টেলিভিশনের প্রচারে আবির্ভূত হয়ে এই অনুষ্ঠান দেশের প্রচারে এক ছোট্ট বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলে, সোভিয়েত টেলিভিশনে এর আগে কখনো না হওয়া নতুন ধরন ও নতুন গতি নিয়ে আসে. আর "টেলিভিশনের প্রচারে অশান্তির রূপকার" এই যুবক তার সাংবাদিকের পেশার হাতেখড়ি করেছিলেন "মস্কো রেডিও" তে, তখন বিদেশ সম্প্রচারের নাম ছিল এটাই. ৮০র দশকের মাঝামাঝি মস্কোর সরকারি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউট থেকে পাশ করে বেরিয়ে রেডিওর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ গুলির বিভাগে কাজ শুরু করেছিলেন. আলেকজান্ডার মনে করেন, সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে (যতই প্যারাডক্স বলে মনে হোক না কেন!), বিভাগটি ছিল খুবই গণতান্ত্রিক. আর কারণ ছিল এরকম. আমাদের কাজের একটি পাশাপাশি রোজগার বাড়ানোর উপায় ছিল, সেটা হল পশ্চিমের বুর্জোয়া সংবাদ মাধ্যমের খবরের খেয়াল করা. সেই রকম অবস্থায় পিয়াতনিত্স্কায়ার বিখ্যাত বাড়ী টিতে আমাদের স্বাধীনতার জন্ম হয়েছিল, যা আমাদের পরে অন্য পাঁচটা যুবকের তুলনায় অনেকটা অন্যরকম হতে সাহায্য করেছিল. আলেকজান্ডার লিউবিমভ বলেছেনঃ

আমার জন্য এটা সম্পূর্ণ বিস্ময় জাগানো সময় ছিল, সব অতুলনীয়. আমি ভাবতেও পারতাম না যে এরকম হতে পারে. যেমন আমাদের ট্রেড ইউনিয়নের মিটিং হতে পারে ডেনমার্কের ভাষায়. যেমন, বিদেশ সম্প্রচারের রেডিও প্রচারে বলতে হয় না "সোভিয়েত দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারন সম্পাদক", কারণ ডেনমার্কের লোকেরা তা বুঝতেই পারবে না, বলা হয় – "পার্টির নেতা". সোভিয়েত লোকজনের জন্য অসমসাহসিক ব্যাপার. সব মিলিয়ে আমাদের রেডিও তে তখন অবিশ্বাস্য রকমের স্বাধীন আবহাওয়া ছিল, নিজের কথা বলতে পারার সুবিধা, সৃষ্টি করার সুবিধা, আর এর জন্য এমন কি মাইনে দেওয়া হত! আমরা পশ্চিমের খবরের কাগজ পড়তে পারতাম, শুনতে পারতাম বুর্জোয়া রেডিও, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে একই ঘটনাকে দেখতে পারতাম. এটা রোমহর্ষক ব্যাপার. সব মিলিয়ে আমার পেশাগত উন্নতির জন্য এই সময় ছিল খুবই সুন্দর সময়.

সোভিয়েত সেন্সর সমস্ত কথা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না, প্রতিটি কথার ভাঁজ খেয়াল করা ছিল অসম্ভব. আর এটা অবচেতনে আমাদের করেছিল আরও স্বাধীন, বলেছেন আলেকজান্ডার লিউবিমভ. খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার ছিল সেই সময়, একমাত্র বিদেশ সম্প্রচারেই সম্ভব ছিল পার্টির পলিটব্যুরোর ঘোষণা বা পার্টির সাধারন সম্পাদকের রিপোর্ট কেটে ছেঁটে প্রচার করার, সাধারন সোভিয়েত সংবাদ মাধ্যমে তা করা ছিল অসম্ভব. সে সময়ের জন্য এটা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের স্বাধীনতা. কি করে লিওনিদ ব্রেজনেভের বক্তব্য কমানো সম্ভব? কিন্তু সেটা না করলে বিদেশী শ্রোতারা মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারবে না তাই করতে হত.  

আলেকজান্ডার লিউবিমভ বলেছেন — এই বিদেশ সম্প্রচারের কাজ করতে গিয়ে আমরা বুঝতে পারতাম, আমাদের শ্রোতারা অধীর উত্সাহে এই সোভিয়েত দেশের রেডিও শুনে থাকেন. কারণ তখন মস্কো রেডিও ছিল একমাত্র সম্ভাব্য খবরের উত্স, যেখান থেকে বিদেশীরা জানতে পারতেন কি হচ্ছে "লৌহ যবনিকার" আড়ালে.  

 আমরা সবসময়েই আমাদের শ্রোতাদের চিঠির উত্তর দিতাম, তাঁদের সঙ্গীতের দরবারের অনুরোধের গান শোনাতাম. তাঁদের খুবই ভাল লাগত কিছু একটা আধুনিক বিষয়, তাই আমরাও প্রচার করতাম বিভিন্ন রক গ্রুপের রক এন্ড রোল. এই রকমের ইচ্ছে খুশী, সে সময়ের সোভিয়েত দেশের প্রচার মাধ্যমে ছিল অসম্ভব. আর আমরা সারাক্ষণ এই সবই করতাম. বোধহয় আমাদের সেন্সর ছিল খুবই কম.

আলেকজান্ডার বলছেনঃ ৮০ বছরের বিদেশ সম্প্রচারে অনেক বিখ্যাত কথা ও রূপকথা রেডিও র সম্বন্ধে চালু হয়েছে. কিন্তু আমার মতে সবচেয়ে মনে রাখার মতো ব্যাপার হয়েছিল রুস্ত কে নিয়ে. ১৯৮৭ সালে যখন এক জার্মান পাইলট নেমে পড়েছিল রেড স্কোয়ারে, সেই ঘটনা অনেকেই ভাল করে মনে রেখেছেন, কিন্তু তাদের সাক্ষ্য প্রায়ই মেলে না. তাই সবটা দারুণ ইন্টারেস্টিং. আমি আর আমার এক সহকর্মী শুধু মাত্র এই ঘটনার সাক্ষী ছিলাম না, আমরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়েও পড়েছিলাম. আমরা যখন প্লেন টা দেখতে পেলাম, তখন ঠিক করলাম, বাড়তি রোজগার করার একটা ভাল ছুতো পাওয়া গেল.

আমার সহকর্মী বলল, আমি চললাম ঘটনাটা চাক্ষুষ দেখে আসতে, বাড়তি রোজগার থেকে আমার আর তোর বিয়ারের পয়সা উঠে যাবে, তুই বরং এই সময়টা আমার হয়ে কাজ করে দে.  তাই ঠিক হল, ও চলল রেড স্কোয়ার. যখন ও সেখানে পৌঁছল ততক্ষণে কে জি বি র লোকেরা তো রুস্ত কে ঘিরে ফেলেছে. আমরা অবশ্যই সবটা খবর হিসাবে প্রচার করে দিলাম, বাড়তি রোজগার তো লোভনীয় বটেই. তারপর শুরু হল এক বিরাট স্ক্যাণ্ডাল, কারণ "মস্কো রেডিও" তো সব সারা দুনিয়াকে জানিয়ে দিয়েছে, আর তার মানে হল একটা বিদেশী এরোপ্লেনের রেড স্কোয়ারের মত জায়গায় নেমে পড়া জানা জানি হয়ে গেল. এই জন্য আমাদের যা "পুরস্কার" দেওয়া হল তা হল আমাদের ডাক পড়ল সোভিয়েত দেশের সরকারি রেডিও ও দূরদর্শনের প্রধানের ঘরে, তাঁকে দেখে মনে হল যেন, এক বিশাল দুর্গের "ল্যুসিফার". আমার মনে হয়েছিল যে, আমাদের প্রধান দেখছিলেন, আমরা সত্যিই এই অহেতুক উত্তেজনার সৃষ্টির জন্য কাজ করেছি, না কি স্রেফ ঘটনা ক্রমে পর্যবেক্ষক, যারা কয়েকটা পয়সা পাওয়ার লোভে এই কাজ করেছি. আমরা অবশ্য আমাদের ফালতু রোজগারের আশায় যে এই কাজ করা তা বলতে বাকি রাখি নি, আর মনে হয়েছিল তিনি তা বিশ্বাসও করেছেন. আর তার পর প্রধান বোধহয় কোন গুপ্তচর বা প্রতি গুপ্তচর সংস্থা কে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এটা কটা বোকা লোক বিয়ারের লোভে গিয়েছিল…

১৯৮৭ সাল থেকে আলেকজান্ডার লিউবিমভ কাজ করছেন টেলিভিশনে. এখন তিনি সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ভেস্তি র একজন প্রধান. নিজে লিউবিমভ একেবারে ঠিক করে জানেন যে, সোভিয়েত বিদেশ সম্প্রচারের সমস্ত বিধিনিষেধ পেরিয়ে পিয়াতনিত্স্কায়ার বাড়ী টিতে কাজের আবহাওয়া ছিল একেবারে সৃষ্টি করার উপযুক্ত এবং বলা যেতে পারে বোহেমিয়ান. আর এই কারণেই ভাল প্রতিভাবান সাংবাদিক হয়ে বেড়ে ওঠার জন্য এটা একটা সবচেয়ে ভাল জায়গা ছিল.    

         "রেডিও রাশিয়ার" ৮০ বছরের জয়ন্তী উপলক্ষে এই প্রথম বার, সারা বিশ্বে যারা রুশী ভাষায় রেডিও স্টেশন চালনা করছেন, তাদের সবাই কে নিয়ে নভেম্বর মাসে মস্কোতে এক উত্সবের আয়োজন করা হয়েছে. আপনাদের সবাই কে মস্কোতে আসার আমন্ত্রণ জানাই.

<audio>