"রেডিও রাশিয়া" কোম্পানীর ৮০ বছরের জয়ন্তী উপলক্ষে শ্রোতাদের সাথে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও মনোরঞ্জক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে, যাঁরা বিদেশে প্রচারের ইতিহাসে তাঁদের শ্রোতাদের আলাপ করিয়ে দিয়েছেন এক দূরের অজানা দেশের সাথে. আর এঁদের মধ্যে অনেক বিদেশী ছিলেন, যাঁরা তাঁদের জন্মভূমি ছেড়ে এসেছিলেন নানা কারণে ও পরে "মস্কোর কন্ঠস্বরে" পরিণত হয়েছিলেন. সেই ভাবেই গত শতকের তিরিশের দশকে মস্কো রেডিও তে এসেছিলেন অনেক স্প্যানীশ ভাষায় কথা বলা মানুষ, তাঁরা ছিলেন সারা বিশ্বের সমস্ত কম্যুনিষ্ট পার্টির সংগঠনের কেন্দ্রীয় পরিচালক সংস্থা কমিন্টার্নের স্প্যানীশ ভাষায় কথা বলা দেশ গুলির থেকে সদস্য এবং তাঁদের সন্তান সন্ততিরা. তাঁরা ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় মস্কোতে এসেছিলেন গৃহহীণ হয়ে. কয়েক দশক পরে এই সব লোকেদের সন্তানরা মস্কো রেডিও তে কাজ করতে এসেছিলেন, তাদের মাতৃভাষা রুশী ও স্প্যানীশ দুটোই ছিল. তাঁদের মধ্যেই ছিলেন আমাদের আজকের উপাখ্যানের নায়ক মিগেল বাস.

     সত্তরের দশকে সমস্ত যুব সমাজের প্রিয় ছিল রক এন্ড রোল. কিশোর দের মধ্যে গীটার বাজিয়ে কয়েক টা অন্ততঃ গান তুলে ফেলতে চেষ্টা করছে না এরকম পাওয়া কঠিন ছিল. মিগেল বাস অনেক দূর এগিয়ে ছিলেন, উনি একটি গ্রুপে স্প্যানীশ ভাষায় গানের সাথে বাজাতেন. বড়দের গ্রুপের কেউ একজন এই কিশোর দের গান শুনে তাদের মস্কো রেডিও র স্প্যানীশ ভাষার বিভাগে ডেকে গান রেকর্ড করতে বলেছিল. এই ভাবেই মিগেল বাস হঠাত্ করেই "মস্কো রেডিও" তে পৌঁছে ছিলেন এবং তাতে অনেক দিনের জন্য রয়েও গেলেন. প্রথমে তাঁকে ভার দেওয়া হয়েছিল গানের বিভাগের, তার পর উনি হলেন ভাষ্যকার এবং পরে স্বরচিত অনুষ্ঠান করতে শুরু করেছিলেন.

    আমি মনে করি যে আমার কপাল ভাল ছিল. আমি এসেই এমন সব মানুষের দেখা পেয়ে গেলাম, যাঁরা প্রথম স্প্যানীশ ভাষায় অনুষ্ঠান মস্কো থেকে শুরু করেছিলেন. এঁরা সকলেই ছিলেন, অসাধারণ সব মানুষ. এঁরা পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন না এবং রেডিও তে এসেছিলেন প্রায় অবিশ্বাস্য সব পথে. মিগেল বাস বলছেনঃ

   স্পেনের বাণিজ্য তরণীর এক ক্যাপ্টেন ছিলেন, তিনি যখন মাঝ দরিয়াতে তখন স্পেনে ক্ষমতায় এলেন জেনেরাল ফ্রাঙ্কো. তিনি ফ্রাঙ্কো অনুগামী দের হাতে যাতে তাঁর জাহাজ দখল না হয়ে যায়, তাই এসে ভিড়লেন ওডেসার বন্দরে. যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল, তখন তিনি চলে গেলেন সুদূর পূর্বে, তাঁকে একটা জাহাজ দেওয়া হল ও তিনি তখন যুদ্ধ কালীণ ল্যান্ড লীজ চুক্তি অনুযায়ী জাহাজে করে মাল পরিবহন করতে লাগলেন. তাঁর শুধু জাহাজের ক্যারাভানের মধ্যে নিজের জাহাজ চালাতে অনিচ্ছা ছিল, কারণ তিনি জানতেন এই ক্যারাভান গুলোই শত্রু পক্ষ একসাথে ডুবিয়ে দিচ্ছে. কিন্তু সরকার ভাবল যখন দলের সাথে যেতে চাইছে না তখন নিশ্চয় ই ক্যাপ্টেন বিদেশী চর, তাই তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হল সাইবেরিয়ার জেলে. জেল থেকে নির্দোষ বলে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি যোগ দিলেন মস্কো রেডিও তে. এই সব লোকেরাই মস্কো রেডিও র শুরুর দিকে ছিলেন.

    আমার এই রেডিও তে সাংবাদিকতা বা খবর যে সোজাসুজি ভাবে মন কাড়ত তা নয়, বরং তখন কার বিদেশ সম্প্রচারের লোকেদের সৃষ্টির আবহাওয়া পেশার অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল. কারণ আমরা শুধু শ্রোতাদের প্রাত্যহিক জীবনের কথাই বলতাম না, চেনাতাম এমন এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সাথে, যা পৃথিবীর কাছে অজানা রয়ে গিয়েছিল.

    আমাদের পুশকিন ও লেরমন্তভের সম্বন্ধে দারুণ সব অনুষ্ঠান হত. আর সে সব অনুষ্ঠানের জন্য আমরা নিজেরাই অনুবাদ করতাম, কবিতা, গান, গল্প, রেডিও তে পড়বার উপযুক্ত করে তুলতাম সেগুলিকে, আমাদের মধ্যে কেউ পেশাদার অভিনেতা না হলেও. কয়েকদিন আগে আমাকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, "ভাসিলি তেরকিন" নামের রেডিও নাটক টি আমাকে রেডিও সংগ্রহ থেকে যোগাড় করে দেওয়া হবে, আমিও সেটা তৈরীর সময় তাতে অংশ নিয়ে ছিলাম. দারুণ হয়েছিল সেটা. আমি বলতে চাই যেটা তা হল আমাদের কাজ ছিল স্রষ্টার, খুবই চিত্তাকর্ষক. আর সকলেরই মন চাইত কিছু একটা নিজের মত করে তৈরী করতে.

    বিদেশ সম্প্রচারের আবহাওয়াটাই অসাধারণ ছিল. এখানে বিশ্বের নানা প্রজাতি ও সংস্কৃতির বিভিন্ন মানুষেরা একসাথে কাজ করত, কথা বলত. একে অপরের সাথে মেলামেশা করত, যা সকলেরই প্রয়োজনীয় ছিল. খবর পড়ার কয়েক মিনিট আগে নানা ভাষার ভাষ্যকারেরা এক জায়গায় হয়ে, সর্ব শেষ সংবাদের বিষয়ে মতামত বিনিময় করতেন. এমন কি কখনো এই রকম সময়ে মজার ঘটনাও ঘটত. মিগেল বাস বলেছেনঃ

    মনে পড়ছে একদিন ঠিক খবর পড়ার আগে, রোজকারের মতই প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল, যার সঙ্গে অনুষ্ঠানের কোন যোগাযোগই নেই, স্প্যানীশ ভাষার ভাষ্যকার কথা বলতে গিয়ে কাজে দেরী হয়ে যাওয়ায় দৌড়ল তার স্টুডিও তে খবর পড়তে, আর গিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দেখে তার হাতে রয়ে গেছে আরবী ভাষার খবর. সে বারের মত তাঁকে খবর পড়তে হল স্মৃতির ভরসায়.

    গরবাচভের পেরেস্ত্রোইকার সময়ে মিগেল বাস ঠিক করেছিলেন স্প্যানীশ নাগরিকত্ব নিতে, আর ১০ বছর পরে রাশিয়া থেকে একেবারেই চলে গেলেন. ইচ্ছে হয়েছিল পূর্ব পুরুষদের মতো স্প্যানীশ ভাষার দেশে বাকী জীবন থেকে যাওয়ার. মিগেল বাস বলেছেনঃ

    আমি একেবারে অন্য পরিবেশে গিয়ে পড়লাম, উরুগুয়েতে. আমার ওখানে একটা বাগান বাড়ী ছিল, তাতে সাঁতার কাটার পুল ছিল, সমুদ্রের পার ও অসাধারণ. কিন্তু জীবন এত বোরিং হয়ে গেল যে বলার মত নয়, ওখানের লোকের আলোচনার বিষয় হয় ফুটবল নয় তো গরুর অসুখ, এমন অসুখ. যা এখানে কেউ জানেও না হয় বলে, তাই বলেও কোন লাভ নেই. আর ঠিক এই সময়টাতেই রাশিয়াতে আবার সব ঘটতে শুরু করল. আমার মনে হয়, আমাকে বাদ দিয়েই সব চলছে.

    আজ মিগেল বাস আবার মস্কোতে থাকেন, এসেছেন অবশ্য "রেডিও রাশিয়ার" কাজ নিয়ে নয়. উনি এখন স্প্যানীশ সংবাদ সংস্থা "ই এফ ই" র রাশিয়ার প্রতিনিধি অফিসের প্রধান. কিন্তু নিজের প্রথম কাজের জায়গা সম্বন্ধে এক দিনের জন্য ও ভুলে যান নি.

    "রেডিও রাশিয়ার" ৮০ বছরের জয়ন্তী উপলক্ষে এই প্রথম বার, সারা বিশ্বে যারা রুশী ভাষায় রেডিও স্টেশন চালনা করছেন, তাদের সবাই কে নিয়ে নভেম্বর মাসে মস্কোতে এক উত্সবের আয়োজন করা হয়েছে.

<sound>