ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতের ঐকতানঃ বোধ হয় এইটি সেন্ট পিটার্সবার্গের মূল স্বপ্ন, যে অঞ্চল যাদুঘরের শহর, ঐতিহাসিক কেন্দ্র ও প্রাসাদ বহুল শহরতলির জন্য ইউনেস্কোর বিশ্ব সমাজের ঐতিহ্যের সম্পদের তালিকায় নথিবদ্ধ হয়েছে.

    বাস্তবে এই স্বপ্নের রূপায়ণ যথেষ্ট কষ্টসাধ্য কাজ. একটি উদাহরণ দেওয়াই বোধ হয় যথেষ্ট হবেঃ বিখ্যাত মারিনস্কি থিয়েটারের লাগোয়া আরেকটি প্রাসাদ নির্মাণের গত বেশ কয়েক বছর ধরে চলা প্রচণ্ড গণ্ডগোলের ইতিহাস টাকেই ধরা যেতে পারে. সমস্ত পিটার্সবার্গ এক সঙ্গে প্রতিরোধে নেমেছিল, যখন চেষ্টা হয়েছিল বিখ্যাত ফরাসী স্থপতি দোমিনিক পেরোর পরিকল্পনায় প্রাসাদটি নির্মাণ করতে. এর মানে হত শহরের ঐতিহাসিক অংশে যেখানে দিগন্ত রেখাতে দৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করে মাত্র কয়েকটা তীক্ষ্ণ মিনারের মাথা, সেখানে আকাশ ঢেকে দিত এক বিশাল অদ্ভূত আকারের সোনালী গম্বুজ. এরকম এক অদ্ভূত দিগন্ত রেখার গয়না শহরের মধ্যে পিটার্সবার্গের জনসাধারন মেনে নিতে পারে নি. এই ভুল শোধরাতে অনেক দিন লেগে গেল, প্রথমে বিখ্যাত স্থপতি গেলেন রেগে, তারপর গোল বাধল এই নিয়ে আলোচনার প্রতিনিধিদের মধ্যে, আবার করে অপেরার জন্য প্রাসাদের আকৃতি নিয়ে টেন্ডার ডাকা হল. অবশেষে, এই কিছুদিন আগে বিষয় টার সমাপ্তি হয়েছে, পিটার্সবার্গের বিশেষজ্ঞরা একটি কানাডার স্থপতি দলের প্রকল্পকে নজরে আনলে সবাই রাজী হতে পেরেছে. মারিনস্কি থিয়েটারের প্রধান ভালেরি গিয়ের্গিয়েভ এই সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করেছেন.

    আমরা পেরোর পরিকল্পনা থেকে সরে গিয়েছিলাম কারণ এই রকম অদ্ভূত পরিকল্পনায় যাতে আর ফিরতে না হয়. বর্তমানে যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে সেটা পিটার্সবার্গে, রাশিয়াতেই নির্মাণ সম্ভব বলেছেন ভালেরি গিয়ের্গিয়েভ. রাশিয়াতে নানা রকম অদ্ভূত দর্শণের থিয়েটার হল ও প্রাসাদ অনেক বানানো হয়েছে, আমরা আর সেই সব বিষয়ে ফিরতে চাই না.

    বাস্তবে দেখা গেল যে, শহরের ভেতরেই স্থাপত্যে ঐকতান ঘটানো সম্ভব. যেমন, ফিন উপসাগরের তীরে শহরতলিতে কনস্তানতিনের বিখ্যাত প্রাসাদের প্রকল্প কাউকেও কোন ভাবে আঘাত করে নি. এইখানে প্রাসাদের ভিতরে রয়েছে আধুনিক শিল্পকলার প্রদর্শনী, তার ওপরে বিশেষ ধরনের অক্সন হাউস খোলা হয়েছে, যেখানে রাশিয়ার শিল্পীদের বাইরের দেশে থাকার সময় আঁকা ছবি কিনতে পারা যায়. এই অক্সনে কেনা ছবি গুলি শুধু মাত্র রাশিয়াতেই সংগ্রহশালাতে রাখা যায়.

    কিছুদিন আগেও কনস্তানতিনের প্রাসাদে রাখা হয়েছিল বিশ্ব বিখ্যাত রাশিয়ার সঙ্গীতকার মিস্তিস্লাভ রস্ত্রপোভিচ ও গালিনা ভিশনেভস্কায়ার সংগৃহীত অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীতে রাশিয়ার খ্যাতনামা শিল্পীদের চিত্র ও ভাস্কর্য. এখন এখানে পিটার্সবার্গের নামী চিত্রশিল্পী বরিস চেত্কভের স্বপ্নের বাস্তব নাম দেওয়া ব্যক্তিগত চিত্র প্রদর্শনী চালু রয়েছে. যদিও এই স্বপ্নীল বাস্তবের ছায়া রাশিয়াতে বিশেষত পিটার্সবার্গের শিল্পের ঐতিহ্যে সব সময়েই দেখতে পাওয়া গেছে. পিটার্সবার্গের এই বিশিষ্ট ঐতিহ্য. যা কয়েক শতাব্দী ধরে জমা হয়েছে, পুশকিন, গোগোল, দস্তয়েভস্কি ও মান্দেলশ্তামের রচনায়. এই সব রচনায় পিটার্সবার্গ এক অদ্ভূত শহর, এর অলিন্দের পিছনে লুকোনো কত ইতিহাস যা মানুষের উপর অদেখা প্রভাব ফেলে, যা মানুষকে অবাস্তব কল্পনা ও সাহসী শৈল্পিক সিদ্ধান্তে উদ্বুদ্ধ করে. এই রকমই আজ পিটার্সবার্গ – খোলা আকাশের নীচে যাদুঘর.