উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক পরীক্ষার পর থেকেই সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা ও বিশেষজ্ঞেরা নানা রকম মতামত দিচ্ছেন, কিন্তু যে বিষয়ে সবাই একমত তা হল, এই নিরাপত্তার বিষয়ে বিপদ একই সঙ্গে সারা দুনিয়ার ও বিশেষত ওই অঞ্চলের জন্য. বিশদ করে এ বিষয়ে লিখছেন রেডিও রাশিয়ার সমীক্ষক ইগর দেনিসভ.

    দ্বিতীয় পরমাণু বোমার মাটির তলায় পরীক্ষা, ঘন ঘন রকেট ছোঁড়ার আর যুদ্ধ নিবৃত্তি চুক্তি থেকে নিজেদের আলাদা করার এই কাজের পেছনে পিয়ং ইয়ং এর যুক্তি কি? চীনের বিশেষজ্ঞ ঝাং লিয়াংগুই, যার অভিমত সরকারি কাগজ চায়না ডেইলী ছাপিয়েছে, তা হল, উত্তর কোরিয়ার এই কাজের পেছনে রয়েছে তাদের দেশের "আভ্যন্তরীন অবস্থার সমস্যা", আন্তর্জাতিক কোনো সমস্যা এর পেছনে নেই. চৈনিক বিশেষজ্ঞ খুবই কড়া সমালোচনা করেছেন তাদের যারা এর পেছনে উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক পরীক্ষাকে "তাস খেলার থিয়োরীর" সাথে তুলনা করতে চাইছেন, বুঝিয়ে বলতে গেলে কারও কারও ধারণা মতে উত্তর কোরিয়া কোনো সিরিয়াস আণবিক বোমা বানানোর পরিকল্পনা করছে না. এই পারমানবিক হঠকারিতা স্রেফ আমেরিকা আর আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ার চেষ্টা ও নানা রকমের বৈঠকের ট্রাম্প কার্ড ছাড়া আর কিছু নয়.

    কিন্তু অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে যাদের সঙ্গে বহু চীনা পর্যবেক্ষকেরা একমত ও যারা খুবই খুঁটিয়ে দেখছেন প্রতিবেশী দেশটির অবস্থা, তারা মনে করেন যে উত্তর কোরিয়া মোটেও মিথ্যে ভয় দেখাচ্ছে না. আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পিয়ংইয়ং সত্যিই আণবিক বোমা বানাচ্ছে. উদ্দেশ্য হল নেতৃত্বের "ঐতিহাসিক লক্ষ্য" যাতে উত্তর কোরিয়াকে সত্যিকারের আণবিক শক্তিধর দেশ বানানো যায়. এক্ষেত্রে পারমানবিক অস্ত্র হল দেশের শক্তি ও উন্নতির প্রতীক.

    এই ধারণার সপক্ষে প্রমাণ দেয়, দক্ষিণ কোরিয়ার সিওল থেকে পাওয়া সামরিক গুপ্তচর সংস্থার তথ্য. উত্তর কোরিয়া আর এক দুই সপ্তাহের মধ্যেই দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়তে চলেছে. এটাই দেখাবে এই দেশের পরিবর্ধিত ক্ষমতার রূপ. কয়েকটি বিদেশী সমীক্ষায় অবশ্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, এই শক্তি প্রদর্শন আসলে দেশের ভিতরের জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, কারণ দেশের নেতা কিম চেন ইর তাঁর পরবর্তী দেশনায়ক হিসাবে তৃতীয় পুত্রকে নির্বাচন করেছেন. তাই এই সব পর্যবেক্ষকদের মতে এটা হল ক্ষমতা হাত বদলের সময় দেশের রাজনৈতিক ওপর মহলের লোকদের একসাথে ধরে রাখা.

    কিন্তু এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কোথায়? আন্তর্জাতিক ভাবে এর সমাধানে কি করা হবে? এই দেশের বিরুদ্ধে এখন একঘরে করার রাজনীতি কি কোনো ফল দেবে, যদি এটা উত্তর কোরিয়ার কোনো উদ্দেশ্য মূলক দিক পরিবর্তন না হয়ে শুধুমাত্র দেশের আভ্যন্তরীন রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো শক্ত উপস্থাপনা মূলক ব্যাপার হয়? এক্ষেত্রে রাশিয়ান বিজ্ঞান একাডেমীর অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের কোরিয়ান পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান কোরিয়া বিশেষজ্ঞ গিওর্গি তোলোরায় বলেছেনঃ

    "আমি মনে করি না যে, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে একঘরে করে দেওয়ার রাজনীতি কোনো কাজে লাগবে, ওদের ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে. এই দেশের বিরুদ্ধে এরকম ব্যবস্থার তেমন কোনো ভবিষ্যত নেই, বরং এটা অনেকটাই লোক দেখানো কাজ হবে. এতে করে স্রেফ দেখানো হবে যে, বিশ্ব কোরিয়ার পারমানবিক পরীক্ষা ও রকেট ছোঁড়ার একটা প্রতিক্রিয়া দেখালো মাত্র. কোনো বিশেষ ধরনের অননুমোদনের জন্য অনেক দিক ভেবে ভারসাম্য বজায় রেখে তবেই তা কাজে পরিণত করতে হবে. ভয় পাচ্ছি যে, যদি গা জোয়ারী করে কিছু করা হয়, তাহলে উত্তর কোরিয়া আরও হিংস্র হয়ে উঠে নতুন কঠিন সমস্যার সৃষ্টি করবে আর তা এই উপদ্বীপ অঞ্চলের অবস্থা আরও সঙ্গীণ করে তুলবে. শেষে বলতে চাই এই কথাই যে, ভাব দেখিয়ে কোনো কাজ হবে না, বাস্তবিক রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে মন দিতে হবে আর আমাদের সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে".

    এ বিষয়ে এটাই লিখেছেন রেডিও রাশিয়ার সমীক্ষক ইগর দেনিসভ.